কাজটি গুরুত্বপূর্ণ, প্রয়োজনীয় এবং সময়মতো শেষ করাও জরুরি—সবই জানা আছে। তবু অনেক সময় দেখা যায়, কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়ার পরও শুরু করা যাচ্ছে না। ডেস্কে বসে থাকা, বই খুলে রাখা কিংবা ল্যাপটপ চালু করার পরও কাজের অগ্রগতি হয় না। দিনের পর দিন এমন পরিস্থিতি চলতে পারে। সাধারণভাবে একে অনেকেই অলসতা বা ইচ্ছাশক্তির অভাব হিসেবে দেখেন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, কঠিন বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো কাজ শুরু করতে না পারার পেছনে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কিছু প্রতিক্রিয়া কাজ করে। স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার ইনস্টিটিউট ফর নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড কার্ডিওভাস্কুলার রিসার্চের ক্লিনিক্যাল পিএইচডি ফেলো ও স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. ডমিনিক এনজি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তাঁর মতে, মানুষের মস্তিষ্ক স্বভাবতই শক্তি সঞ্চয় করতে এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে চায়। ফলে কোনো কাজ বড়, জটিল বা অনিশ্চিত মনে হলে মস্তিষ্ক সেটিকে শুরু করার আগেই একধরনের মানসিক প্রতিরোধ তৈরি করে। এই প্রতিরোধের কারণেই অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ কাজও দীর্ঘদিন পিছিয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাজ শুরু করতে না পারার পেছনে প্রধানত দুটি ধরনের মানসিক প্রতিরোধ কাজ করে।
প্রথমটি হলো আবেগগত প্রতিরোধ বা ইমোশনাল রেজিস্ট্যান্স। কোনো কাজ বাস্তবে যতটা কঠিন, মস্তিষ্ক সব সময় সেটি সেইভাবে মূল্যায়ন করে না। বরং কাজটি কত বড় বা ভীতিকর বলে মনে হচ্ছে, সেটির ওপর প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে। উদাহরণ হিসেবে পুরো বাড়ি পরিষ্কার করার কথা ভাবলে অনেকের কাছেই কাজটি চাপের মনে হতে পারে। কিন্তু যদি শুধু একটি প্লেট ধোয়ার কথা ভাবা হয়, তখন সেটি অনেক সহজ মনে হয়। অর্থাৎ কাজের পরিধি যত বড় মনে হবে, মানসিক চাপও তত বাড়বে।
দ্বিতীয়টি হলো আত্মপরিচয় রক্ষার প্রতিরোধ বা ইগো প্রটেকশন। অনেক সময় মানুষ নিজের সম্পর্কে কিছু স্থায়ী ধারণা তৈরি করে নেয়। যেমন কেউ ভাবতে পারেন তিনি গণিতে ভালো নন, খেলাধুলার মানুষ নন বা সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে হবে। এসব বিশ্বাস কাজ শুরু করার আগেই ব্যর্থতার ভয় তৈরি করে এবং মস্তিষ্ককে পিছিয়ে যেতে উৎসাহিত করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মানসিক বাধা অতিক্রম করতে কয়েকটি সহজ কৌশল কার্যকর হতে পারে।
প্রথম কৌশল হলো ‘দুই মিনিটের নিয়ম’। পুরো কাজ শেষ করার চাপ না নিয়ে মাত্র দুই মিনিট কাজ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। একটি পৃষ্ঠা পড়া, একটি বাক্য লেখা বা কয়েকটি ব্যায়াম দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাজের সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো শুরু করা। একবার শুরু হলে কাজ চালিয়ে যাওয়া তুলনামূলক সহজ হয়।
দ্বিতীয় কৌশল হিসেবে শুধু প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদি মূল কাজ শুরু করা কঠিন মনে হয়, তাহলে কাজের পরিবেশ তৈরি করুন। বই টেবিলে রাখুন, প্রয়োজনীয় পোশাক পরুন বা কম্পিউটার চালু করুন। এতে মানসিক প্রতিরোধ কমে এবং কাজ শুরু করার সম্ভাবনা বাড়ে।
তৃতীয়ত, নিজেকে পুরস্কৃত করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। কোনো কাজ শেষ করার পর পছন্দের পানীয় পান করা, প্রিয় অনুষ্ঠান দেখা বা ছোট কোনো আনন্দদায়ক কাজ করার পরিকল্পনা মস্তিষ্ককে উৎসাহিত করে। এতে কঠিন কাজের সঙ্গে ইতিবাচক অনুভূতির সম্পর্ক তৈরি হয়।
চতুর্থ কৌশল হলো কাজকে আরও উপভোগ্য করে তোলা। ব্যায়ামের সময় পছন্দের পডকাস্ট শোনা, ঘর গোছানোর সময় গান চালানো কিংবা লেখালেখির সময় প্রিয় চা বা কফি পান করা কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
পঞ্চম পরামর্শ হলো নিখুঁত হওয়ার চাপ থেকে বেরিয়ে আসা। ‘আমাকে অবশ্যই নিখুঁত হতে হবে’—এই মানসিকতার পরিবর্তে ‘আমি চেষ্টা করছি’ বা ‘আমি পরীক্ষা করে দেখছি’—এমন চিন্তা গ্রহণ করলে ব্যর্থতার ভয় কমে যায় এবং শেখার আগ্রহ বাড়ে।
ষষ্ঠ ও শেষ কৌশল হলো নিজের পরিচয়বোধে পরিবর্তন আনা। ‘আমাকে ফিট হতে হবে’ ভাবার বদলে ‘আমি নিয়মিত ব্যায়াম করতে পছন্দ করি’—এভাবে চিন্তা করলে মস্তিষ্ক নতুন আচরণকে সহজে গ্রহণ করতে পারে। কারণ মানুষ সাধারণত নিজের পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠিন কাজ শুরু করতে না পারা সব সময় অলসতার লক্ষণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া। সঠিক কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে এই বাধা অতিক্রম করে কাজের প্রতি মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।
সিএ/এমআর
সূত্র: ব্রেইন হেলথ ডিকোডেড


