একসময় ধারণা ছিল, মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক আজীবন অটুট থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক পরিবারে ‘নো কন্ট্যাক্ট’ বা সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। অনেক মা-বাবা এটিকে অকৃতজ্ঞতা বা অবাধ্যতা হিসেবে দেখলেও গবেষণা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাত ও অপূর্ণ সম্পর্কের পরিণতি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সাধারণত হঠাৎ করে সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয় না। বরং বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা হতাশা, অবহেলা, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ এবং আবেগগত দূরত্ব একসময় তাদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন গবেষক যৌথভাবে পরিচালিত একটি গবেষণায় ৮৯৮ জন মা-বাবা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘গিভিং ভয়েস টু দ্য সাইলেন্স অব ফ্যামিলি এসট্রেঞ্জমেন্ট: কমপেয়ারিং রিজনস অব এসট্রেঞ্জড প্যারেন্টস অ্যান্ড অ্যাডাল্ট চিলড্রেন ইন আ ননম্যাচড স্যাম্পল’। গবেষণায় পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণ নিয়ে দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবারা প্রায়ই সন্তানের সম্পর্ক, বন্ধু-বান্ধবের প্রভাব বা অতিরিক্ত স্বাধীনচেতা আচরণকে সম্পর্ক ভাঙনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করেন বিষাক্ত আচরণ, পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থনের অভাব এবং নিজেদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়াকে।
মনের বন্ধুর হেড অব মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম এবং লিড সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর কাজী রুমানা হক বলেন, “মা-বাবা যখন পৃথিবীতে সন্তানকে নিয়ে আসেন, তখন মনে করেন যেহেতু আমার মাধ্যমে এসেছে, আমার মতো চলবে। কিন্তু একজন আলাদা মানুষ হিসেবে সন্তানেরও আলাদা মতামত থাকতে পারে। বিষয়টি অনেক সময়ই উপেক্ষা করা হয়। অভিভাবক হিসেবে মনে করেন, আমরা অনেক করেছি ওর জন্য। কিন্তু কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেন না, আমিও তো ব্যস্ততার কারণে বা কাজের কারণে সময় দিচ্ছি না। সন্তানের ওপর রেগে গিয়ে অনেকে গায়ে হাত তোলেন অথবা সাইলেন্স ট্রিটমেন্ট দেন। এটা খারাপ। বড় হওয়ার পরও সন্তান এটা মনে রাখে।”
তিনি আরও বলেন, “সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, সন্তানের অর্জনকে ছোট করে দেখা। এটা সন্তানদের মনে ক্ষোভ তৈরি করে। অনেক সময় আমরা দেখেছি যে সন্তানেরা ছোটবেলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মা-বাবার মন ভরানো যায় না। পরীক্ষায় ৮০ বা ৯০ নম্বর পেলেও তাঁদের চাওয়া থাকে যেন ১০০ পাই। অর্জনগুলোকে অবহেলা করেন দেখে বন্ধন ভেঙে যায়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যারেন্টিং স্টাইলও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেসব পরিবারে সন্তানদের অনুভূতি, মতামত ও সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, সেখানে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। অনেক সময় মা-বাবারা নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন বা প্রত্যাশা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সম্পর্কচ্ছেদের কারণ হিসেবে আবেগগত নির্যাতন, অতিরিক্ত সমালোচনা, অসম্মান, বিশ্বাসভঙ্গ এবং শৈশবের মানসিক দূরত্বের বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা মনে করেন, পরিবারে তাদের অনুভূতি কখনো গুরুত্ব পায়নি।
অন্যদিকে অনেক মা-বাবা বিশ্বাস করেন, সন্তানকে বাইরের কেউ প্রভাবিত করেছে। তবে গবেষকদের মতে, বাস্তবে অনেক সন্তান প্রথমবারের মতো পরিবারবহির্ভূত কোনো সম্পর্ক থেকে সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে নিজের পারিবারিক সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করতে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, সমাজে এখনও মা-বাবার আচরণের সমালোচনাকে অনেক সময় অকৃতজ্ঞতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে সন্তান নিজের কষ্ট বা মানসিক আঘাতের কথা বলতে চাইলেও তা গুরুত্ব পায় না। ধীরে ধীরে সে উপলব্ধি করে, তার কথা কেউ শুনছে না বা বুঝতে চাইছে না।
গবেষণা বলছে, সম্পর্কচ্ছেদ সাধারণত প্রতিশোধমূলক কোনো সিদ্ধান্ত নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি নিজের মানসিক সুস্থতা, আত্মসম্মান এবং নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নেওয়া কঠিন একটি সিদ্ধান্ত। দীর্ঘদিন সম্পর্ক ঠিক রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই অনেক প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পথ বেছে নেয়।
সিএ/এমআর


