টানা ২৪ ঘণ্টা উপবাস বা না খেয়ে থাকা সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে বেশ আলোচিত একটি অভ্যাস। অনেকেই মনে করেন, নির্দিষ্ট সময় খাবার থেকে বিরত থাকলে ওজন কমে, বিপাকক্রিয়া উন্নত হয় এবং শরীর নতুনভাবে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। তবে এ সময়ে শরীরের ভেতরে একাধিক জৈবিক পরিবর্তন ঘটে, যা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার গ্রহণ বন্ধ হওয়ার পর শরীর প্রথমে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে লিভারে জমা থাকা গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে। এই মজুত কমে এলে শরীর শক্তির উৎস হিসেবে সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার শুরু করে এবং কিটোন উৎপন্ন হয়। একই সঙ্গে গ্লুকাগনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং ইনসুলিনের মাত্রা কমতে থাকে।
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সাধারণত স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে যারা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অভ্যাসে অভ্যস্ত নন, তাদের মধ্যে ক্ষুধা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বিরক্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া বা দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা উপবাসে রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যায় না, কারণ যকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী গ্লুকোজ সরবরাহ করে।
তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ গ্রহণকারী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী, শিশু এবং দুর্বল বা বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ধরনের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ উপবাস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপকারিতার দিকও রয়েছে
২০২৩ সালে ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন (NCBI)-এ প্রকাশিত ‘ফিজিওলজি, ফাস্টিং’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাস শরীরে উল্লেখযোগ্য বিপাকীয় পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, নিয়মিত উপবাস ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, যা মেটাবলিক সিনড্রোম ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি শরীরের অতিরিক্ত চর্বি, রক্তচাপ এবং ক্ষতিকর লিপিড কমাতেও এটি সহায়ক হতে পারে। প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় আলঝেইমার ও পারকিনসনের মতো স্নায়বিক রোগের অগ্রগতি ধীর হওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।
অতিরিক্ত উপবাসের ঝুঁকিও আছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে অনেকের মাথাব্যথা হতে পারে। এর পেছনে হাইপোগ্লাইসেমিয়া, পানিশূন্যতা, ক্যাফেইন প্রত্যাহার কিংবা প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় উপবাসের কারণে কর্টিসলসহ কিছু হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা পেশি ক্ষয় এবং প্যারাডক্সিক্যাল ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শিশু, কম ওজনের ব্যক্তি এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ উপবাসের নিরাপত্তা নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তাই এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস শুরুর আগে অবশ্যই একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সিএ/এমআর


