শৈশবের একটি স্মৃতি তুলে ধরে বর্তমান সমাজে বৈষয়িকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং পরার্থপরতার সংকট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন জনপ্রিয় আলেম ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি বলেন, অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য বাড়লেও মানুষের হৃদয়ের উদারতা আগের মতো বৃদ্ধি পায়নি। আর সে কারণেই বিত্তবান হয়েও অনেক মানুষ প্রকৃত সুখ খুঁজে পাচ্ছেন না।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মাদরাসা জীবনের একটি আবেগঘন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পোস্টের শুরুতে তিনি লিখেছেন:
“মাদরাসা জীবনের এক লজিংবাড়িতে পেঁয়াজ-মরিচ আর পান্তাভাত ছিল আমার নিয়মিত খাবার।
আজ চারিদিকে যখন বৈষয়িকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা আর স্বার্থপরতার মন খারাপ করা নানান গল্প শুনি, তখন শৈশবের সেই স্মৃতিটা বারবার মনে পড়ে যায়।
স্মৃতিটি একইসাথে করুণ আবার মধুরও।”
তিনি জানান, তখন তাঁর বয়স ছিল এগারো-বারো বছর। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার দোয়ালিয়া গ্রামের একটি মাদরাসায় কিতাব বিভাগের প্রাথমিক শ্রেণিতে পড়াশোনা করতেন। সে সময় গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থীদের লজিংয়ে রেখে পড়ানোর প্রচলন ছিল। উন্নত খাবারের আশায় তিনি একটি পরিবারের লজিংয়ে থাকতে শুরু করেন।
শায়খ আহমাদুল্লাহ লেখেন, যেসব পরিবার শিক্ষার্থীদের লজিংয়ে রাখতেন, তাঁদের অধিকাংশই ধনী ছিলেন না। বরং দূর-দূরান্ত থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব নেওয়াকে তারা মানবিক ও নৈতিক কর্তব্য মনে করতেন।
তিনি বিশেষভাবে একটি দরিদ্র পরিবারের কথা স্মরণ করেন, যাদের ঘর ছিল বাঁশের বেড়া ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি। সামান্য বাতাসেই ঘর কেঁপে উঠত, দিনের আলো বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করত। সেই ঘরেই তিনি বহুবার বসে খাবার খেয়েছেন।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন:
“এই পরিবারটির কাছে যখন আমার খাবারের পালা আসত, পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে পান্তাভাতের থালা সাজিয়ে দিত। আর সাথে থাকত বাড়ির পোষা মুরগির ডিম ভাজি। হলুদ রঙের ডিম ভাজিটি সাদা পান্তার পটভূমিকায় প্লেট জুড়ে ফুলের মতো ফুটে থাকত।”
তিনি বলেন, তখন বিষয়টি উপলব্ধি না করলেও এখন বুঝতে পারেন, সেই পরিবারের জন্য একটি ডিমও ছিল মূল্যবান সম্পদ ও আয়ের অন্যতম উৎস। তারপরও তারা আন্তরিকতার সঙ্গে একজন অচেনা শিক্ষার্থীর জন্য সেই খাবারের ব্যবস্থা করতেন।
শায়খ আহমাদুল্লাহর ভাষায়:
“আজ হতে বহু বছর আগে অচেনা এক মাদরাসা-বালকের জন্য হতদরিদ্র পরিবারটি যে দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন, ভাবলে এখন হৃদয় বিগলিত হয়।
এই পরিণত বয়সে এসে এখন উপলব্ধি করতে পারি, গরিব হলেও তাদের হৃদয়টা ছিল বড়। সেই বড় হৃদয় তাদেরকে অমন দুঃসাহসী হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল।”
তিনি বর্তমান সমাজের সঙ্গে অতীতের তুলনা করে বলেন, এখন অর্থনৈতিকভাবে মানুষ অনেক বেশি স্বচ্ছল হলেও আত্মীয়-স্বজন কিংবা অতিথিকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা কমে গেছে।
তিনি লেখেন:
“আজ আমরা, গ্রাম বলুন কিংবা শহর, অর্থনৈতিকভাবে ওই পরিবারটির চেয়ে বহুগুণ ভালো আছি। কিন্তু তারপরও অচেনা শিক্ষার্থীর দু বেলা খাবারের দায়িত্ব নেয়া দূরে থাক, আত্মীয়-স্বজন আসলেই বেশিরভাগ মানুষ আমরা বিরক্ত হই। আত্মীয় বিদায় নিলে স্বস্তিবোধ করি।
কেন এমন হলো?
কারণ, সময়ের পালাবদলে আজ আমাদের অর্থের বৈভব বেড়েছে, কিন্তু হৃদয়টা সেভাবে বড় হয়নি।
ফলে এই সংকীর্ণ হৃদয়ে পরার্থপরতা ও ত্যাগের মতো মহৎ গুণের আর জায়গা হয় না। আর একারণে বিত্তবান হওয়া সত্ত্বেও আত্মিকভাবে আমরা সুখী হয়ে উঠতে পারছি না।”
পোস্টের শেষাংশে তিনি মহানবী (সা.)-এর একটি হাদিস উল্লেখ করে লেখেন:
“নবীজি (সা.) ঠিকই বলেছেন, ধন-সম্পদ বেশি থাকাই প্রকৃত ধনাঢ্যতা নয়; বরং প্রকৃত ধনাঢ্যতা হলো আত্মার ধনাঢ্যতা।
তাই আসুন, প্রকৃত সুখী মানুষ হওয়ার জন্য অল্পে তুষ্ট থাকি, আত্মাকে বড় বানাই, ভোগ নয় ত্যাগের সাধনায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখি।”
সিএ/এমআর


