প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে একটি বিশাল গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় ডাইনোসরদের আধিপত্য। সেই ঘটনার পর থেকেই বিজ্ঞানীদের অন্যতম বড় উদ্বেগ, ভবিষ্যতে যদি আবার কোনো প্রাণঘাতী গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তাহলে মানবসভ্যতাকে কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব হবে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কৌশল নিয়ে গবেষণা চলছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ে সম্ভাব্য গ্রহাণু প্রতিরোধ প্রযুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ধারাবাহিকটির সপ্তম পর্বে উঠে এসেছে পৃথিবীমুখী গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তনে পারমাণবিক বিস্ফোরণ এবং মহাকাশযানের সংঘর্ষভিত্তিক কৌশলের নানা দিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো গ্রহাণুর গায়ে সরাসরি আঘাত না করে সেটির খুব কাছাকাছি স্থানে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হলে উৎপন্ন তাপ ও শক্তি গ্রহাণুর পৃষ্ঠের কিছু অংশকে বাষ্পে পরিণত করতে পারে। এর ফলে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়াশীল ধাক্কা গ্রহাণুর গতিপথ সামান্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হতে পারে। মহাকাশের বিশাল দূরত্ব বিবেচনায় এই সামান্য পরিবর্তনও দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, একাধিক পারমাণবিক বিস্ফোরণের সম্মিলিত ধাক্কা কোনো গ্রহাণুকে পৃথিবীর পথ থেকে উল্লেখযোগ্য দূরত্বে সরিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে পাথরের স্তূপসদৃশ গ্রহাণুগুলোর ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে এর সফলতা নির্ভর করে অনেকগুলো জটিল বিষয়ের ওপর।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়। কোনো বিপজ্জনক গ্রহাণুকে যত আগে শনাক্ত করা যাবে, সেটির গতিপথ পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তত বাড়বে। বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কার্যকর পদক্ষেপ নিতে অন্তত ১০ বছর সময় হাতে থাকা প্রয়োজন। কেউ কেউ আরও বেশি সময়ের পক্ষে মত দেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, গ্রহাণুর কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন আনলেও সেটি ভবিষ্যতে অন্য কোনো কক্ষপথে ফিরে এসে আবারও পৃথিবীর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। ফলে একবারের সফলতা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না।
এই আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে ‘৯৯৯৪২ অ্যাপোফিস’ নামের একটি পরিচিত গ্রহাণুর উদাহরণ। প্রায় ৩৪০ মিটার ব্যাসের এই গ্রহাণুকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক মহাজাগতিক বস্তুর তালিকায় রাখা হয়েছে। বর্তমানে হিসাব অনুযায়ী ২০২৯ সালে এটি পৃথিবীর খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, ওই সময় সরাসরি সংঘর্ষের কোনো আশঙ্কা নেই। তবে একসময় ধারণা করা হয়েছিল, এটি যদি মহাকাশের বিশেষ কিছু অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে, তাহলে ভবিষ্যতে এর গতিপথ এমনভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, যা পৃথিবীর জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে।
এই বিশেষ অঞ্চলগুলোকে বলা হয় ‘গ্র্যাভিটেশনাল কী-হোল’। এগুলো মহাকাশের ক্ষুদ্র এলাকা, যেখানে প্রবেশ করলে কোনো গ্রহাণুর কক্ষপথ ভবিষ্যতে নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রহাণুর গতিবেগে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিবর্তন আনতে পারলেও এমন কী-হোল এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
তবে শুধু পারমাণবিক বিস্ফোরণই নয়, বিকল্প প্রযুক্তিও নিয়ে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত পদ্ধতি হলো ‘কাইনেটিক ইমপ্যাক্ট’ বা নিয়ন্ত্রিত সংঘর্ষ।
এই ধারণার বাস্তব প্রয়োগ প্রথম দেখা যায় নাসার ডিপ ইমপ্যাক্ট মিশনে। ২০০৫ সালে একটি মহাকাশযানকে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘টেম্পল ১’ নামের একটি ধূমকেতুর সঙ্গে সংঘর্ষ করানো হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ধূমকেতুর অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। সংঘর্ষের ফলে বিপুল পরিমাণ ধুলো ও বরফ ছিটকে বের হয়, যা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
পরবর্তীতে আরও বড় পদক্ষেপ নেয় নাসা। ডার্ট মিশনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই মিশনের লক্ষ্য ছিল ডাইমরফোস নামের একটি ছোট গ্রহাণু।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ডার্ট মহাকাশযানটি ডাইমরফোসের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত সংঘর্ষ ঘটায়। সংঘর্ষের ফলে গ্রহাণুটির কক্ষপথে পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন আসে এবং এটি আগের তুলনায় কম সময়ে তার মূল সঙ্গী গ্রহাণু ডিডিমোসকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ডার্ট মিশনের সফলতা প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীর জন্য হুমকি হয়ে ওঠা কোনো গ্রহাণুর গতিপথ পরিবর্তন করা তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং বাস্তবে সম্ভব। যদিও এই প্রযুক্তিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবু এটি ভবিষ্যতে গ্রহাণু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষকদের ভাষ্য, পারমাণবিক বিস্ফোরণ হোক বা নিয়ন্ত্রিত সংঘর্ষ—কোনোটিই শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তবে সম্ভাব্য মহাজাগতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় মানবজাতির হাতে কার্যকর কিছু প্রযুক্তিগত বিকল্প যে রয়েছে, সাম্প্রতিক মহাকাশ মিশনগুলো সেটিই প্রমাণ করেছে।
সিএ/এমআর


