অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার নিয়ে সমাজে নানা ভ্রান্ত ধারণা ও অপতথ্য প্রচলিত রয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা ও সহায়তা পেতে বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা ছড়িয়ে দিয়ে এসব ভুল ধারণা দূর করা জরুরি, যাতে অটিজমের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুরা প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারে।
অটিজম কোনো রোগ নয়—এটি একটি স্নায়ু বিকাশজনিত সমস্যা। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন প্রণীত ডায়গনোস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিজঅর্ডারস এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রণীত ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজেস অনুযায়ী অটিজমকে নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অনেকের ধারণা, অটিজমের চিকিৎসা নেই, তাই চিকিৎসার প্রয়োজনও নেই। বাস্তবে অটিজম আজীবনের একটি অবস্থা হলেও নিয়মিত থেরাপি ও চিকিৎসার মাধ্যমে জীবনমান উন্নত করা সম্ভব। মৃদু অটিজমের ক্ষেত্রে শিশুরা উপযুক্ত সহায়তা পেলে প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, আর গুরুতর ক্ষেত্রে থাকা শিশুরাও প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, শৈশবে মা-বাবার আচরণ বা খারাপ প্যারেন্টিংয়ের কারণে অটিজম হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধারণা সঠিক নয়। অটিজমের পেছনে জিনগত, পরিবেশগত ও স্নায়বিক কারণ কাজ করে, প্যারেন্টিংয়ের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই।
অনেকে মনে করেন, অটিজমের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সব শিশুই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। কিন্তু অটিজম একটি বিস্তৃত পরিসরের অবস্থা, যেখানে কেউ বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে, আবার কেউ অত্যন্ত মেধাবীও হতে পারে। অনেক শিশুই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করে।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা কখনোই কথা বলতে পারে না—এমন ধারণাও প্রচলিত। বাস্তবে প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু কথা বলতে পারে না, তবে বাকিরা বিভিন্ন মাত্রায় কথা বলতে সক্ষম। উপযুক্ত স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপির মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করা যায়। যারা কথা বলতে পারে না, তারাও বিকল্প উপায়ে যোগাযোগ করতে শেখে।
ভ্যাকসিন নিলে অটিজম হয়—এ ধারণারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, টিকার সঙ্গে অটিজমের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং টিকা না নিলে শিশুরা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো, অটিজমের চিকিৎসায় ওষুধের কোনো ভূমিকা নেই। বাস্তবে বিশ্বব্যাপী অটিজমের চিকিৎসায় ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা সরাসরি অটিজম নিরাময় না করলেও শিশুর আচরণগত সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
অনেকে মনে করেন, অটিজমের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুরা ভালোবাসা বা আবেগ অনুভব করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তারা ভালোবাসা অনুভব করে, তবে প্রকাশের ধরন ভিন্ন হতে পারে। অনেক সময় তারা চোখে চোখ না রাখলেও তাদের আবেগ ও অনুভূতির ঘাটতি থাকে না।
সিএ/এমআর


