গ্রিসের রাজধানী অ্যাথেন্স থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত মেথানা আগ্নেয়গিরি নিয়ে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো আগ্নেয়গিরি দীর্ঘ সময় শান্ত থাকলেই সেটিকে ‘বিলুপ্ত’ ভাবার সুযোগ নেই। বরং লাখ বছরেরও বেশি সময় সুপ্ত থাকার পরও তা আবার অগ্নুৎপাত ঘটাতে পারে।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ১০ হাজার বছর অগ্নুৎপাত না ঘটালে আগ্নেয়গিরিকে মৃত বা বিলুপ্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে মেথানা আগ্নেয়গিরির সাত লাখ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বলছেন, এ ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, মেথানার সবচেয়ে দীর্ঘ শান্ত সময় ছিল প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার বছর থেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার বছর আগে পর্যন্ত। কিন্তু ওই সময়েও আগ্নেয়গিরির নিচে ম্যাগমা জমা হচ্ছিল এবং ভেতরে চলছিল ধীর গতির ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও ইটিএইচ জুরিখের আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ রাজভান-গ্যাব্রিয়েল পোপা বলেন, “মেথানার দীর্ঘ নীরবতার সময়টি ছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগে। তাই আমরা শিলা ও খনিজে থাকা রাসায়নিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এর অতীত পুনর্গঠন করছি।”
তিনি আরও বলেন, “মাটির ওপরে আমরা আগ্নেয়গিরির খুব সামান্য অংশ দেখি। এর বেশিরভাগ ভূতাত্ত্বিক ব্যবস্থা ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকে।”
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর ভূত্বকের নিচে থাকা ম্যান্টলে ম্যাগমা তৈরি হয়। এই ম্যাগমা ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠে জমা হতে হতে একসময় উপরের দিকে উঠে আসে এবং তখনই অগ্নুৎপাত ঘটে। কিন্তু কখনও কখনও ম্যাগমা উপরে ওঠার বদলে ভেতরেই আটকে থাকে।
পোপা বলেন, “আমরা এখন বুঝতে পারছি, সাবডাকশন জোনের অনেক আগ্নেয়গিরি বাইরের দিক থেকে শান্ত দেখালেও ভেতরে ম্যাগমা তৈরি হতে থাকে।”
তিনি জানান, এসব ম্যাগমা সাধারণত জলীয় উপাদানে সমৃদ্ধ বা ‘সুপার-হাইড্রোস’ ধরনের হয়। এই ম্যাগমা ভূত্বকের ভেতর দিয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে ধীরে ধীরে ঘন ও আঠালো হয়ে পড়ে। ফলে এর গতি শত থেকে হাজার গুণ পর্যন্ত কমে যায় এবং তা সহজে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে না।
এর ফলে ম্যাগমা চেম্বারের ভেতরে ধীরে ধীরে গলিত পদার্থ জমা হতে থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই জমে থাকা ম্যাগমাই ভবিষ্যতে বড় ধরনের অগ্নুৎপাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় আগ্নেয় শিলা থেকে ১ হাজার ২৫০টিরও বেশি জিরকন স্ফটিকের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে জিরকন পাওয়া যায়নি, সেখানে ইলমেনাইটসহ অন্যান্য খনিজ বিশ্লেষণ করে আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম বোঝার চেষ্টা করেছেন গবেষকরা।
পোপা বলেন, “গভীরে ম্যাগমা জমা হলে ক্ষুদ্র ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়, যা মানুষ টের না পেলেও সিসমোমিটার সহজেই শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া মাটির সামান্য ফুলে ওঠাও স্যাটেলাইট ও জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ধরা সম্ভব।”
মেথানা আগ্নেয়গিরি অ্যাথেন্সের খুব কাছাকাছি হলেও বর্তমানে এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে না বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। তবে ভবিষ্যতে অগ্নুৎপাত ঘটলেও তা অতীতের মতো সাধারণ লাভা প্রবাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু গ্রিসেই নয়; ইতালি, জাপান, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক আপাত-নিষ্ক্রিয় আগ্নেয়গিরিতেও থাকতে পারে।
বর্তমানে গবেষকরা রোমানিয়ার ‘সিওমাডুল’ আগ্নেয়গিরি নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা করছেন। প্রায় ৩০ হাজার বছর ধরে শান্ত থাকা এই আগ্নেয়গিরির নিচেও সক্রিয় ম্যাগমা চেম্বার থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পোপা বলেন, “মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগ্নেয়গিরির দীর্ঘ নীরবতা সবসময় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।”
সিএ/এমআর


