Thursday, June 18, 2026
27.7 C
Dhaka

গ্রিসের মেথানা: দীর্ঘ নীরবতার পরও জেগে উঠতে পারে আগ্নেয়গিরি

গ্রিসের রাজধানী অ্যাথেন্স থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত মেথানা আগ্নেয়গিরি নিয়ে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো আগ্নেয়গিরি দীর্ঘ সময় শান্ত থাকলেই সেটিকে ‘বিলুপ্ত’ ভাবার সুযোগ নেই। বরং লাখ বছরেরও বেশি সময় সুপ্ত থাকার পরও তা আবার অগ্নুৎপাত ঘটাতে পারে।

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ১০ হাজার বছর অগ্নুৎপাত না ঘটালে আগ্নেয়গিরিকে মৃত বা বিলুপ্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে মেথানা আগ্নেয়গিরির সাত লাখ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বলছেন, এ ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, মেথানার সবচেয়ে দীর্ঘ শান্ত সময় ছিল প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার বছর থেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার বছর আগে পর্যন্ত। কিন্তু ওই সময়েও আগ্নেয়গিরির নিচে ম্যাগমা জমা হচ্ছিল এবং ভেতরে চলছিল ধীর গতির ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।

গবেষণাটির প্রধান লেখক ও ইটিএইচ জুরিখের আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ রাজভান-গ্যাব্রিয়েল পোপা বলেন, “মেথানার দীর্ঘ নীরবতার সময়টি ছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগে। তাই আমরা শিলা ও খনিজে থাকা রাসায়নিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এর অতীত পুনর্গঠন করছি।”

তিনি আরও বলেন, “মাটির ওপরে আমরা আগ্নেয়গিরির খুব সামান্য অংশ দেখি। এর বেশিরভাগ ভূতাত্ত্বিক ব্যবস্থা ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকে।”

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।

বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর ভূত্বকের নিচে থাকা ম্যান্টলে ম্যাগমা তৈরি হয়। এই ম্যাগমা ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠে জমা হতে হতে একসময় উপরের দিকে উঠে আসে এবং তখনই অগ্নুৎপাত ঘটে। কিন্তু কখনও কখনও ম্যাগমা উপরে ওঠার বদলে ভেতরেই আটকে থাকে।

পোপা বলেন, “আমরা এখন বুঝতে পারছি, সাবডাকশন জোনের অনেক আগ্নেয়গিরি বাইরের দিক থেকে শান্ত দেখালেও ভেতরে ম্যাগমা তৈরি হতে থাকে।”

তিনি জানান, এসব ম্যাগমা সাধারণত জলীয় উপাদানে সমৃদ্ধ বা ‘সুপার-হাইড্রোস’ ধরনের হয়। এই ম্যাগমা ভূত্বকের ভেতর দিয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে ধীরে ধীরে ঘন ও আঠালো হয়ে পড়ে। ফলে এর গতি শত থেকে হাজার গুণ পর্যন্ত কমে যায় এবং তা সহজে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে না।

এর ফলে ম্যাগমা চেম্বারের ভেতরে ধীরে ধীরে গলিত পদার্থ জমা হতে থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই জমে থাকা ম্যাগমাই ভবিষ্যতে বড় ধরনের অগ্নুৎপাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

গবেষণায় আগ্নেয় শিলা থেকে ১ হাজার ২৫০টিরও বেশি জিরকন স্ফটিকের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে জিরকন পাওয়া যায়নি, সেখানে ইলমেনাইটসহ অন্যান্য খনিজ বিশ্লেষণ করে আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম বোঝার চেষ্টা করেছেন গবেষকরা।

পোপা বলেন, “গভীরে ম্যাগমা জমা হলে ক্ষুদ্র ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়, যা মানুষ টের না পেলেও সিসমোমিটার সহজেই শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া মাটির সামান্য ফুলে ওঠাও স্যাটেলাইট ও জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ধরা সম্ভব।”

মেথানা আগ্নেয়গিরি অ্যাথেন্সের খুব কাছাকাছি হলেও বর্তমানে এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে না বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। তবে ভবিষ্যতে অগ্নুৎপাত ঘটলেও তা অতীতের মতো সাধারণ লাভা প্রবাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু গ্রিসেই নয়; ইতালি, জাপান, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক আপাত-নিষ্ক্রিয় আগ্নেয়গিরিতেও থাকতে পারে।

বর্তমানে গবেষকরা রোমানিয়ার ‘সিওমাডুল’ আগ্নেয়গিরি নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা করছেন। প্রায় ৩০ হাজার বছর ধরে শান্ত থাকা এই আগ্নেয়গিরির নিচেও সক্রিয় ম্যাগমা চেম্বার থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পোপা বলেন, “মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগ্নেয়গিরির দীর্ঘ নীরবতা সবসময় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।”

সিএ/এমআর

spot_img

আরও পড়ুন

বদর যুদ্ধের নেপথ্যে: রহস্যময় কিছু স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা

ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়,...

আইকিউ নয়, জীবনের সাফল্যে কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইকিউ

মানুষের বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে আইকিউ বা ইন্টেলিজেন্স...

ডাইনোসরের বিবর্তনে নতুন তথ্য দিল গবেষণা

ডাইনোসর যুগের অন্যতম ভয়ংকর শিকারি হিসেবে পরিচিত টিরানোসরাস রেক্স...

বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে ঘুমের ঘাটতি হলে যেভাবে সামলাবেন

ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনায় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ রাত জেগে...

হিজরতের পথচলা শুরু হয়েছিল যেভাবে, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পটভূমি

ইসলামের ইতিহাসে হিজরত একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তবে মদিনায় হিজরতের...

হিমশৈলের সংখ্যা বৃদ্ধি বদলে দিচ্ছে গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রিনল্যান্ডের হিমবাহ থেকে ভেঙে পড়া বিশালাকার...

বৈদেশিক ঋণ নাকি স্বনির্ভরতা: ইসলামের প্রস্তাব কী

আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ গ্রহণকে অনেক...

এআইয়ের পর আসছে এজিআই, ডিজাইনাররা কি ডাইনোসর হয়ে যাবে

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের (গ্রাফিক...

লেনোভোর নতুন এআই ল্যাপটপে যুক্ত হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি

দেশের বাজারে নতুন ল্যাপটপ এনেছে লেনোভো। গ্লোবাল ব্র্যান্ড পিএলসির...

খেটে খাওয়া মানুষের বাজেটকে ‘চানাচুর’ বলায় সমালোচনা প্রধানমন্ত্রীর

সাধারণ মানুষের কল্যাণে প্রণীত বাজেটকে কিছু মহল ‘চানাচুর’ ও...

কোরআন শুদ্ধভাবে পড়ার গুরুত্ব জানুন

কোরআন মাজিদ মহান আল্লাহর কালাম এবং মানবজাতির জন্য হেদায়েতের...

দীর্ঘজীবী ঘরোয়া পাঁচ গাছ, যত্ন নিলে বেঁচে থাকে বছরের পর বছর

অন্দরসজ্জার পাশাপাশি ঘরের পরিবেশ সুন্দর রাখতে গাছের ব্যবহার দিন...

২০৬০ সালের মধ্যে ভরাট হয়ে যেতে পারে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি জলাশয়

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সুপেয় পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস জলাশয়গুলো ধীরে...

রামগঞ্জে ছাত্রের মৃত্যুকে ঘিরে উত্তেজনা, একাডেমিতে ভাঙচুর

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে বিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকে মেহেদী হাসান (১৫)...
spot_img

আরও পড়ুন

বদর যুদ্ধের নেপথ্যে: রহস্যময় কিছু স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা

ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। এই যুদ্ধের আগে ও যুদ্ধ চলাকালে দেখা কয়েকটি...

আইকিউ নয়, জীবনের সাফল্যে কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইকিউ

মানুষের বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে আইকিউ বা ইন্টেলিজেন্স কোশেন্টকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বা ইকিউ...

ডাইনোসরের বিবর্তনে নতুন তথ্য দিল গবেষণা

ডাইনোসর যুগের অন্যতম ভয়ংকর শিকারি হিসেবে পরিচিত টিরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্স। বিশাল দেহ, শক্তিশালী চোয়াল এবং ভয়ংকর শিকারি স্বভাবের জন্য পরিচিত এই প্রাণীর একটি...

বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে ঘুমের ঘাটতি হলে যেভাবে সামলাবেন

ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনায় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ রাত জেগে খেলা উপভোগ করছেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরে ভিন্ন ভিন্ন সময় অঞ্চলে ম্যাচ হওয়ায়...
spot_img