প্রাচীন রোমান আমলের একটি ডুবে যাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ ঘিরে নতুন তথ্য উন্মোচন করেছেন গবেষকরা। জাহাজটির পানিরোধী প্রলেপে আটকে থাকা ক্ষুদ্র পরাগরেণু বিশ্লেষণ করে তারা এর নির্মাণস্থান, যাত্রাপথ এবং সে সময়কার উন্নত নৌ-প্রযুক্তির নানা দিক সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার কেবল একটি জাহাজের ইতিহাস নয়, বরং দুই হাজার বছরেরও বেশি আগের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রার নতুন দিক সামনে এনেছে।
জাহাজটির নাম ‘ইলোভিক-পারজাইন ১’। ২০১৬ সালে ক্রোয়েশিয়ার উপকূলে এর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে নির্মিত এই বাণিজ্যিক জাহাজটি ইতালি থেকে যাত্রা শুরু করেছিল এবং পরে ক্রোয়েশিয়ার ইলোভিক দ্বীপসংলগ্ন পারজাইন উপসাগরে ডুবে যায়।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন ম্যাটিরিয়ালস’ সাময়িকীতে। এতে গবেষকরা জাহাজের কাঠে ব্যবহৃত পানিরোধী প্রলেপের রাসায়নিক গঠন ও এর মধ্যে আটকে থাকা পরাগরেণু বিশ্লেষণ করেছেন। এসব তথ্য ব্যবহার করে তারা জাহাজটির সম্ভাব্য চলাচলের পথ ও রক্ষণাবেক্ষণের কৌশল সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে, জাহাজটির কাঠের ফাঁক বন্ধ করতে ব্যবহৃত হয়েছিল পাইন জাতীয় গাছের কষ, বিটুমিন, উদ্ভিজ্জ আলকাতরা এবং কিছু ক্ষেত্রে মৌমাছির মোম। এসব উপাদান কাঠকে পচন ও সামুদ্রিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উপাদান ব্যবহারে সে সময়কার কারিগরদের দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
গবেষকরা জাহাজটির গায়ে অন্তত চার স্তরের পানিরোধী প্রলেপের অস্তিত্ব পেয়েছেন। বেশিরভাগ নমুনায় পাইন কষের ব্যবহার দেখা গেলেও একটি স্তরে ‘জোপিসা’ নামের বিশেষ মিশ্রণ পাওয়া গেছে, যাতে মোম ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে প্রলেপ আরও আঠালো ও ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পরাগরেণু বিশ্লেষণ। প্রলেপে আটকে থাকা বিভিন্ন গাছের পরাগরেণু থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন, জাহাজটি সম্ভবত দক্ষিণ ইতালির বর্তমান ব্রিনদিসি বন্দরের আশপাশে নির্মিত হয়েছিল। এছাড়া যাত্রাপথে বিভিন্ন অঞ্চলে এটি মেরামত করা হয়েছিল বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক অ্যার্নেল চ্যারি বলেন, “এসব প্রলেপ জাহাজটির সমুদ্রযাত্রার সাক্ষ্য বহন করছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে সেই সময়ের কারিগররা কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতেন।”
তিনি আরও বলেন, “জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে তেমন কোনো লিখিত ইতিহাস না থাকায় রাসায়নিক বিশ্লেষণ ও পরাগরেণু গবেষণাই আমাদের সবচেয়ে বড় সহায়তা করেছে। বিশেষ করে মোম ও পিচের মিশ্রণটি আমাদের জন্য বড় চমক ছিল।”
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার নৌ-প্রত্নতত্ত্ব গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে, খ্রিস্টপূর্ব যুগেও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময় বেশ উন্নত ছিল।
সিএ/এমআর


