প্রকৃতির প্রতিটি ঘটনার পেছনেই লুকিয়ে আছে নির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক নিয়ম। নদীর পানির প্রবাহ, গিটারের তারের কম্পন কিংবা আমাদের কানে পৌঁছানো শব্দ—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নীতির কার্যকারিতা। প্রবাহবিজ্ঞান, তরঙ্গ এবং শব্দবিজ্ঞানের এসব ধারণাই আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।
ফ্লুইড ডায়নামিক্স বা প্রবাহবিজ্ঞান মূলত তরল ও গ্যাস কীভাবে প্রবাহিত হয়, তা নিয়ে আলোচনা করে। কোনো নৌযান পানির ওপর চলার সময় দুটি প্রধান ধরনের প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। একটি হলো পানির জড়তা এবং অন্যটি সান্দ্রতা, যা তরলের অণুগুলোর পারস্পরিক ঘর্ষণের কারণে সৃষ্টি হয়। এসব প্রবাহের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা রেনল্ডস সংখ্যা ব্যবহার করেন, যা বিজ্ঞানী অসবর্ন রেনল্ডসের নামে নামকরণ করা হয়েছে।
রেনল্ডস সংখ্যার মান কম হলে প্রবাহ শান্ত ও সুশৃঙ্খল থাকে, যাকে ল্যামিনার প্রবাহ বলা হয়। অন্যদিকে এই মান বেশি হলে প্রবাহে বিশৃঙ্খল ঘূর্ণির সৃষ্টি হয় এবং তাকে টারবুলেন্ট প্রবাহ বলা হয়।
প্রবাহবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো বার্নোলির নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো প্রবাহের গতি বাড়লে তার চাপ কমে যায়। উড়োজাহাজের ডানার নকশা এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি। ডানার ওপর দিয়ে বাতাস দ্রুত প্রবাহিত হওয়ায় সেখানে চাপ কমে যায়, আর নিচের অংশে তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপের পার্থক্য উড়োজাহাজকে ওপরের দিকে উত্তোলন করে, যা লিফট নামে পরিচিত।
তরঙ্গ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো মাধ্যম কিংবা শূন্যস্থানের ভেতর দিয়ে শক্তি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে যায়। পুকুরে ঢিল ছুড়ে দিলে চারদিকে যে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, সেটি তরঙ্গের সহজ উদাহরণ। এ ক্ষেত্রে শক্তি স্থানান্তরিত হলেও মাধ্যমের কণাগুলো স্থায়ীভাবে স্থান পরিবর্তন করে না।
পদার্থবিজ্ঞানে সাধারণত দুটি প্রধান ধরনের তরঙ্গ দেখা যায়—অনুপ্রস্থ ও অনুদৈর্ঘ্য। অনুপ্রস্থ তরঙ্গে কণার কম্পনের দিক এবং তরঙ্গের অগ্রগতির দিক পরস্পরের সঙ্গে সমকোণে থাকে। দৃশ্যমান আলোসহ সব ধরনের তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গে কণার কম্পন ও তরঙ্গের গতি একই দিকে ঘটে। শব্দতরঙ্গ এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। এ ধরনের তরঙ্গে সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে শক্তি পরিবাহিত হয়।
পানির ঢেউ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ, যেখানে অনুপ্রস্থ ও অনুদৈর্ঘ্য—দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যই একসঙ্গে দেখা যায়। পানিতে ভাসমান কোনো বস্তু ঢেউয়ের সঙ্গে শুধু ওপর-নিচে নয়, বরং বৃত্তাকার গতিতেও চলতে থাকে।
তরঙ্গ বিশ্লেষণে তিনটি মৌলিক ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। তরঙ্গদৈর্ঘ্য হলো দুটি ধারাবাহিক চূড়ার মধ্যবর্তী দূরত্ব। প্রতি সেকেন্ডে কতটি তরঙ্গ একটি নির্দিষ্ট বিন্দু অতিক্রম করে, তাকে কম্পাঙ্ক বলা হয়। আর তরঙ্গের সর্বোচ্চ উচ্চতাকে বিস্তার বলা হয়।
সব তরঙ্গ সামনের দিকে অগ্রসর হয় না। কিছু তরঙ্গ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে থেকে স্থির অবস্থায় কম্পিত হয়, যেগুলো স্থির তরঙ্গ নামে পরিচিত। গিটারের তারে আঘাত করলে এই ধরনের তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। তারের দৈর্ঘ্য ও কম্পনের ধরনই নির্ধারণ করে কী ধরনের সুর উৎপন্ন হবে।
শব্দ মূলত চাপের পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট এক ধরনের যান্ত্রিক তরঙ্গ, যা গ্যাস, তরল কিংবা কঠিন মাধ্যমে চলাচল করতে পারে। তবে শূন্যস্থানে শব্দ চলাচল করতে পারে না, কারণ সেখানে কম্পন পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় মাধ্যম অনুপস্থিত।
বাতাসে সৃষ্ট চাপের পরিবর্তন কানের পর্দায় আঘাত করলে সেটি কম্পিত হয়। এরপর সেই কম্পন স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে এবং আমরা শব্দ অনুভব করি। একজন সুস্থ মানুষ সাধারণত ২০ হার্জ থেকে ২০ হাজার হার্জ পর্যন্ত কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে সক্ষম হন। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই সীমা ধীরে ধীরে কমে আসে।
শব্দের গতি মাধ্যমভেদে পরিবর্তিত হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বাতাসে শব্দের গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৪৩ মিটার। সাধারণভাবে মাধ্যম যত ঘন হয়, শব্দের গতিও তত বেশি হয়।
শব্দের তীব্রতা ডেসিবল এককে পরিমাপ করা হয়। স্বাভাবিক কথোপকথনের শব্দের মাত্রা প্রায় ৬০ ডেসিবল হলেও মোটরবাইকের ইঞ্জিনের শব্দ ১০০ ডেসিবলেরও বেশি হতে পারে।
প্রবাহ, তরঙ্গ এবং শব্দ—এই তিনটি বিষয়ই পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণার অংশ। আধুনিক বিমান প্রযুক্তি, বাদ্যযন্ত্রের সুর, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রকৃতির অসংখ্য ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে এসব নীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সূত্র: হেজেল মুইরের সায়েন্স ইন সেকেন্ডস বই অবলম্বনে
সিএ/এমআর


