শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় পটাশিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ। পেশির সংকোচন, স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান, হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে রক্তে এই খনিজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়ে গেলে তা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা প্রতি লিটারে ৩ দশমিক ৫ থেকে ৫ মিলিমোলের মধ্যে থাকাকে স্বাভাবিক ধরা হয়। এই মাত্রা ৫ দশমিক ৫ মিলিমোলের বেশি হলে তাকে হাইপারক্যালেমিয়া বলা হয়। এটি জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রয়োজন এমন একটি অবস্থা, কারণ সময়মতো চিকিৎসা না হলে হৃদ্যন্ত্রের মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসকেরা সাধারণত রক্তের সেরাম ক্রিয়েটিনিন ও ইলেকট্রোলাইট পরীক্ষা করে পটাশিয়ামের মাত্রা নির্ণয় করেন। পাশাপাশি ইসিজির মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, সেটিও দেখা হয়। প্রয়োজন হলে প্রস্রাবের পটাশিয়াম, সোডিয়াম ও অসমোলারিটি পরীক্ষাও করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে শরীর থেকে অতিরিক্ত পটাশিয়াম স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ, বিশেষ করে স্টেজ ৪ ও ৫, হঠাৎ কিডনি বিকল হওয়া, কিডনি প্রতিস্থাপনের পর জটিলতা কিংবা ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথির মতো অবস্থায় এই ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এ ছাড়া গুরুতর আঘাতে শরীরের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, রক্তকোষ ভেঙে যাওয়া কিংবা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির হরমোনজনিত সমস্যার কারণেও রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। কিছু ওষুধও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এসিই ইনহিবিটরস, এআরবি, পটাশিয়াম-স্পেয়ারিং ডাইইউরেটিকস এবং কিছু ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহারে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অনেক সময় হাইপারক্যালেমিয়ার কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে বুক ধড়ফড়, বুকে ব্যথা, হৃদ্স্পন্দন অনিয়মিত হওয়া, পেশিতে দুর্বলতা, অবশভাব, খিঁচুনি, বমি ভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় হৃদ্যন্ত্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া বা পক্ষাঘাতের মতো জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি থাকলে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ডাবের পানি, কলা, আলু, টমেটো এবং পটাশিয়ামসমৃদ্ধ কিছু ফল ও শাকসবজি এড়িয়ে চলা উচিত।
অন্যদিকে ঝিঙে, চিচিঙ্গা, চালকুমড়া, পটোল, ডাঁটা, লাউ, মুলা, শসা ও শিম তুলনামূলকভাবে নিরাপদ সবজি হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলের মধ্যে পেঁপে, পেয়ারাসহ আপেল, নাশপাতি, আনারস, বেল ও জামরুল খাওয়া যেতে পারে। শাকের মধ্যে ডাঁটাশাক, লাউশাক, কলমিশাক ও লালশাক পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করা যেতে পারে।
তবে রোগীর বয়স, কিডনির অবস্থা এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার ওপর নির্ভর করে খাদ্যতালিকা ভিন্ন হতে পারে। তাই একজন ডায়েটেশিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন করা সবচেয়ে ভালো। পাশাপাশি কোনো ওষুধের কারণে পটাশিয়াম বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে সেই ওষুধ পরিবর্তন বা সমন্বয় করতে হবে।
সিএ/এমআর


