দাঁতে পোকা হওয়ার কথা আমাদের সমাজে বহুদিন ধরেই প্রচলিত। ছোটবেলার ছড়া থেকে শুরু করে লোকমুখে নানা গল্পে এই ধারণা পাওয়া যায়। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, দাঁতে কোনো ধরনের পোকা বাসা বাঁধে না। দাঁতের ক্ষয়, ব্যথা বা গর্ত হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, যা দীর্ঘদিন ধরে পরিচর্যার অভাবে আরও গুরুতর আকার ধারণ করে।
গ্রামাঞ্চলে একসময় দাঁতের চিকিৎসা সহজলভ্য ছিল না। ফলে দাঁতের ব্যথা নিয়ে অনেকেই কবিরাজ বা লোকজ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতেন। এমনই এক ঘটনার উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় মানসুরা বেগমের কথা। দীর্ঘদিন দাঁতের যন্ত্রণায় ভোগার পর তিনি স্থানীয় এক কবিরাজের কাছে যান। কবিরাজ তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে তাঁর দাঁতে পোকা হয়েছে এবং বিশেষ পদ্ধতিতে সেই পোকা বের করে দেওয়া হবে।
পরদিন সকালে নির্ধারিত সময়ে গিয়ে তিনি দেখেন, কবিরাজ আগে থেকেই সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। একটি হলুদ রঙের কচুর ডাঁটা ও পরিষ্কার তুলা ব্যবহার করে মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করেন তিনি। কয়েক মিনিট পর তুলার ওপর কয়েকটি ছোট সাদা শুঁয়োপোকার মতো প্রাণী দেখিয়ে বলেন, এগুলোই দাঁতের ভেতর থেকে বের হয়েছে। এতে মানসুরা বেগম প্রথমে আশ্বস্ত হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই আবার দাঁতের ব্যথা ফিরে আসে।
আবার কবিরাজের কাছে গেলে তিনি দাবি করেন, দাঁতে পোকার বীজ রয়ে গিয়েছিল, সেখান থেকেই নতুন পোকা জন্মেছে। একইভাবে দ্বিতীয়বারও পোকা বের করে দেখানো হয়। কিন্তু এবারও স্থায়ীভাবে ব্যথা কমেনি। শেষ পর্যন্ত তিনি একজন দাঁতের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং ক্ষতিগ্রস্ত দাঁতের চিকিৎসা নেওয়ার পরই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পান।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা আসলে মানুষের সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগানোর কৌশল। যেসব কবিরাজ দাঁত থেকে পোকা বের করার দাবি করেন, তাঁরা সাধারণত পচা মানকচু বা কচুর ডাঁটা ব্যবহার করেন। বয়স বাড়লে এসব ডাঁটার ভেতরে মাছি বা অন্যান্য পতঙ্গ ডিম পাড়ে এবং সেখান থেকে সাদা রঙের লার্ভা বা শুঁয়োপোকা জন্মায়। পরে কৌশলে সেই লার্ভাগুলো তুলার সঙ্গে দেখিয়ে রোগীদের বোঝানো হয় যে এগুলো দাঁত থেকে বের হয়েছে।
বাস্তবে দাঁতের ভেতরে এত বড় কোনো পোকা বাস করতে পারে না। দাঁতের গর্ত বা ক্যাভিটির ভেতরে যেটি তৈরি হয়, সেটি মূলত ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফল। আমাদের মুখে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। বিশেষ করে স্ট্রেপটোকক্কাস মিউটান্স ও ল্যাকটোব্যাসিলাস দাঁতের ক্ষয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। খাবারের কণা, বিশেষ করে চিনিযুক্ত খাদ্য দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকলে এসব ব্যাকটেরিয়া তা ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে।
এই ল্যাকটিক অ্যাসিড দাঁতের বাইরের শক্ত আবরণ এনামেল ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। ফলে দাঁতে ছোট গর্ত বা ক্যাভিটি তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় গভীর হলে দাঁতের স্নায়ু পর্যন্ত সংক্রমণ পৌঁছে যায়। তখন সামান্য চাপ বা স্পর্শেও তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে প্রতিদিন অন্তত দুইবার ব্রাশ করা, খাবারের পর মুখ পরিষ্কার রাখা এবং অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি। দাঁতের ব্যথা বা গর্ত দেখা দিলে লোকজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত নিবন্ধিত ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।
সিএ/এমআর


