কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা নতুন নয়। তবে এই প্রতিযোগিতা এখন মানুষের মস্তিষ্কভিত্তিক প্রযুক্তিতেও নতুন মাত্রা পেয়েছে। ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদিত ইনভেসিভ ব্রেইন চিপের অনুমোদন দিয়েছে চীন।
নতুন এই চিপটির নাম নিও (NEO)। এটি চীনের সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি এবং নিউরাকল টেকনোলজির যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে চীনের ন্যাশনাল মেডিকেল প্রোডাক্টস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চিপটির বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
নিও চিপটি মূলত ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী এমন রোগীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যাদের মেরুদণ্ডে আঘাতের কারণে হাত-পা অবশ হয়ে গেছে, কিন্তু হাতের পেশিতে কিছুটা কার্যক্ষমতা এখনো রয়েছে। এই চিপের মাধ্যমে তারা রোবটিক গ্লাভস নিয়ন্ত্রণ করে হাতের আঙুল নড়ানো এবং কিছু দৈনন্দিন কাজ করার সুযোগ পাবেন।
বর্তমানে আলোচিত আরেকটি ব্রেইন চিপ প্রযুক্তি হলো ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান নিউরালিংকের এন১ ইমপ্লান্ট। সেই প্রযুক্তিতে সূক্ষ্ম ইলেকট্রোড সরাসরি মস্তিষ্কের কর্টেক্সের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে স্নায়ুকোষের বৈদ্যুতিক সংকেত সংগ্রহ করা হয়।
অন্যদিকে নিও চিপের নকশা তুলনামূলকভাবে কম ইনভেসিভ। অর্থাৎ এটি খুলির ভেতরে স্থাপন করা হলেও ইলেকট্রোডগুলো মস্তিষ্কের টিস্যুর ভেতরে প্রবেশ করে না। বরং ডুরা ম্যাটার নামের সুরক্ষামূলক আবরণের ওপর স্থাপন করা হয়। মুদ্রার সমান আকারের এই চিপে আটটি ইলেকট্রোড সেন্সর রয়েছে, যা মস্তিষ্কের সংকেত সংগ্রহ করে কম্পিউটারে পাঠায়।
পরবর্তীতে কম্পিউটার সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে নির্দেশে রূপান্তর করে এবং তা রোগীর হাতে পরা সফট রোবটিক গ্লাভসে পাঠায়। ফলে রোগী শুধু চিন্তার মাধ্যমে নিজের হাতের আঙুল নড়াতে পারেন এবং কিছু প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিপটি মস্তিষ্কের গভীরে প্রবেশ না করায় রক্তক্ষরণ, টিস্যুর ক্ষতি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। এই নিরাপত্তাজনিত সুবিধার কারণেই চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্রুত বাণিজ্যিক অনুমোদন দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিও চিপের কার্যকারিতার একটি বাস্তব উদাহরণ পাওয়া গেছে চীনের হেনান প্রদেশের ৩৯ বছর বয়সী ডং হুইয়ের ক্ষেত্রে। ছয় বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর ঘাড়ের নিচের অংশ সম্পূর্ণ অবশ হয়ে যায়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে তাঁর মস্তিষ্কে এই চিপ প্রতিস্থাপন করা হয় এবং প্রায় এক বছর পুনর্বাসন কার্যক্রমের পর তিনি রোবটিক গ্লাভসের সাহায্যে একটি কলম ধরতে ও নিজের নাম লিখতে সক্ষম হন। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
চীন শুধু একটি চিপ উদ্ভাবনেই থেমে নেই। দেশটির সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেসকে কৌশলগত প্রযুক্তি খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, চলতি দশকের শেষ নাগাদ এই প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জন করা। বাণিজ্যিক অনুমোদনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই নিও চিপকে চীনের স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থার আওতায়ও আনা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আরও বেশি রোগী এই প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারেন।
এদিকে চীনের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। সাংহাইভিত্তিক নিউরোএক্সএস এমন একটি প্রযুক্তির প্রাথমিক পরীক্ষা চালিয়েছে, যেখানে একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী শুধু চিন্তার মাধ্যমে কম্পিউটারের কার্সার নিয়ন্ত্রণ এবং ঘরের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলও তৈরি করেছে, যা মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করে রিয়েল-টাইমে ম্যান্ডারিন ভাষার বক্তব্যে রূপান্তর করতে পারে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যেসব মানুষ কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন, তাঁদের যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে এই প্রযুক্তি।
সিএ/এমআর


