রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অনেকেই বিছানার পাশে এক গ্লাস পানি রেখে দেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই পানি না খেয়েই সকালে ফেলে দেওয়া হয়। বাইরে থেকে দেখলে এটি অপ্রয়োজনীয় কিংবা অপচয় মনে হলেও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অভ্যাসের পেছনে রয়েছে মানুষের মানসিক নিরাপত্তাবোধ এবং আত্মপ্রস্তুতির একটি গভীর সম্পর্ক।
গবেষকদের মতে, মানুষ অনিশ্চয়তা কমাতে এবং নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখতে নানা ধরনের ছোট ছোট অভ্যাস গড়ে তোলে। এসব অভ্যাস সরাসরি কোনো সমস্যার সমাধান না করলেও মস্তিষ্ককে একটি আশ্বাস দেয় যে, সম্ভাব্য প্রয়োজনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া রয়েছে।
মনোবিজ্ঞানে ‘সেফটি কিউ’ বা নিরাপত্তা সংকেত নামে একটি ধারণা রয়েছে। এটি এমন কিছু প্রতীক বা উপাদানকে বোঝায়, যা বাস্তব পরিস্থিতি পরিবর্তন না করেও মানুষের উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। বিছানার পাশে রাখা পানির গ্লাসকে অনেক বিশেষজ্ঞ এই ধরনের একটি নিরাপত্তা সংকেত হিসেবেই ব্যাখ্যা করেন।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে যদি হঠাৎ তৃষ্ণা লাগে কিংবা শারীরিক অস্বস্তি তৈরি হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় পানির উৎস হাতের নাগালেই আছে—এই ভাবনাটি অবচেতনভাবে মানুষকে স্বস্তি দেয়। ফলে মস্তিষ্ক তুলনামূলক শান্ত থাকে এবং ঘুমের পরিবেশ আরও আরামদায়ক হয়ে ওঠে।
নিদ্রাবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, রাতের সময় মানুষের মস্তিষ্কে এক ধরনের অতিরিক্ত সতর্কতা কাজ করে। চারপাশের পরিবেশ নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চালায় মস্তিষ্ক। এ কারণে অনেকেই ঘুমানোর আগে দরজার তালা পরীক্ষা করেন, আলো ঠিক করেন কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিস নির্দিষ্ট স্থানে রাখেন।
বিছানার পাশের পানির গ্লাসও একই ধরনের মানসিক ভূমিকা পালন করে। এটি হয়তো ব্যবহার করা হয় না, কিন্তু এর উপস্থিতি মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে। গবেষকরা বলছেন, কোনো বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত আছে—এই অনুভূতিই অনেক সময় উদ্বেগ হ্রাসের জন্য যথেষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউটের গবেষণায়ও ঘুমের আগে নিয়মিত রুটিন এবং পরিচিত পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন মানুষ অনুভব করে যে তার আশপাশের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তখন ঘুম আরও গভীর ও স্বস্তিদায়ক হয়।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান শোবার ঘরকে কেবল বিশ্রামের স্থান হিসেবে নয়, বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ হিসেবেও বিবেচনা করে। নিরাপদ পরিবেশের অনুভূতি তৈরি হলে মস্তিষ্ক সতর্কতার মাত্রা কমিয়ে শরীরকে বিশ্রামের অনুমতি দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি পানির গ্লাস, প্রিয় কম্বল, বন্ধ দরজা কিংবা ক্ষীণ আলো—সবই নিরাপত্তা ও স্বস্তির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। বস্তুটির ব্যবহারিক প্রয়োজনের চেয়ে এর মানসিক তাৎপর্যই তখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিছানার পাশে পানি রাখা কোনো অর্থহীন অভ্যাস নয়। বরং এটি মানুষের মানসিক প্রস্তুতি এবং আত্মরক্ষার একটি সূক্ষ্ম কৌশল, যা তাকে অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়।
সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস
সিএ/এমআর


