সন্তান জন্মের পর একজন নারীর শরীর ও মস্তিষ্কে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে—এ বিষয়টি নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। তবে পিতৃত্ব একজন পুরুষের মস্তিষ্কে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণা বলছে, সন্তান জন্মের পর বাবাদের মস্তিষ্কেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে, যা তাঁদের নতুন দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা হওয়া শুধু পারিবারিক পরিচয়ের পরিবর্তন নয়, এটি মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও আচরণেও প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে বাবাদের মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন ঘটে, তা মায়েদের মস্তিষ্কের পরিবর্তনের সঙ্গেও মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী শিক্ষক ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক চিকিৎসক দেবিকা ভূষণ দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকত্ব ও সামাজিক ভূমিকা নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, পিতৃত্ব পুরুষের মস্তিষ্কে এমন কিছু পরিবর্তন আনে, যা আগে ধারণার চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানের যত্ন নেওয়ার অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু নেটওয়ার্ককে সক্রিয় করে তোলে। ২০১৪ সালের এক গবেষণায় প্রধান পরিচর্যাকারী মা ও সহায়ক পরিচর্যাকারী বাবাদের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উভয়ের ক্ষেত্রেই ‘প্যারেন্টাল কেয়ারগিভিং নেটওয়ার্ক’-এ পরিবর্তন আসে।
এই নেটওয়ার্কের একটি অংশ হলো ‘মেন্টালাইজিং নেটওয়ার্ক’, যা অন্যের অনুভূতি বোঝা, সহানুভূতি প্রকাশ এবং সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। অন্য অংশটি হলো আবেগ-প্রক্রিয়াকরণ নেটওয়ার্ক, যা সতর্কতা, আবেগ ও পুরস্কার-সম্পর্কিত অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত।
গবেষণায় দেখা গেছে, মায়েদের ক্ষেত্রে আবেগ-প্রক্রিয়াকরণ নেটওয়ার্ক তুলনামূলক বেশি সক্রিয় থাকে। অন্যদিকে বাবাদের ক্ষেত্রে মেন্টালাইজিং নেটওয়ার্ক বেশি সক্রিয় হতে দেখা যায়। গবেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে শিশুর যত্ন নেওয়ার অভিজ্ঞতাই মস্তিষ্কের পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ।
এদিকে ২০২৩ সালে স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় নতুন বাবাদের মস্তিষ্কে ধূসর পদার্থ বা গ্রে ম্যাটারের পরিমাণ কিছুটা কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। যদিও বিষয়টি শুনতে উদ্বেগজনক মনে হতে পারে, বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি মস্তিষ্কের ক্ষতির লক্ষণ নয়।
তাঁদের মতে, এটি এক ধরনের ‘প্রুনিং’ বা ছাঁটাই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় স্নায়বিক সংযোগ কমে যায় এবং মস্তিষ্ক আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে শেখে। প্রথমবার মা হওয়া নারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। ফলে গবেষকেরা মনে করছেন, সন্তান লালন-পালনের অভিজ্ঞতাই এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে বাবারাও পিতৃত্ব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা উদ্বেগের শিকার হতে পারেন। সাধারণত প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা নিয়ে আলোচনা হলে মায়েদের বিষয়টিই বেশি সামনে আসে। তবে গবেষণা বলছে, প্রতি ১০ জন বাবার মধ্যে প্রায় একজন পিতৃত্ব-পরবর্তী মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হন।
পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সমস্যার লক্ষণ অনেক সময় ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। যেমন অতিরিক্ত রাগ, বিরক্তিভাব, আক্রমণাত্মক আচরণ কিংবা মাদকাসক্তির প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানসিক চাপ শুধু বাবার ওপর নয়, পুরো পরিবারের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মায়েদের ক্ষেত্রে সন্তানের জন্মের পরপরই মানসিক চাপ বা বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিন্তু বাবাদের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস পরে প্রকট হয়ে ওঠে। এর অন্যতম কারণ হতে পারে কর্মজীবনের চাপ এবং ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা পারিবারিক দায়িত্ব।
বিশেষ করে সন্তান জন্মের কিছুদিন পর সহায়ক আত্মীয়স্বজন নিজেদের কাজে ফিরে গেলে এবং মায়েরা কর্মস্থলে যোগ দিলে বাবাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। এ সময় অনেকের মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে বাবারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়ভাবে সন্তানের লালন-পালনে অংশ নিচ্ছেন। ফলে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আবেগগত চাহিদার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
দেবিকা ভূষণের মতে, সন্তান জন্মের পর যে সহায়তা কাঠামো তৈরি করা হয়, সেটি শুধু মাতৃত্বকেন্দ্রিক না হয়ে অভিভাবককেন্দ্রিক হওয়া উচিত। মা ও বাবা উভয়ের মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক সহায়তাকে সমান গুরুত্ব দিলে পরিবার আরও সুস্থ ও স্থিতিশীল হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তান জন্মের পর শুধু শিশুর জীবনেই নয়, মা-বাবার মস্তিষ্কেও পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন তাঁদের নতুন দায়িত্ব গ্রহণে সহায়তা করে। তাই ‘ড্যাড ব্রেইন’ কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা একটি বাস্তব ঘটনা।
সিএ/এমআর


