ফেরি সংকটের কারণে ভোলার ইলিশা ফেরিঘাটে তরমুজবাহী শতাধিক ট্রাক কয়েক দিন ধরে আটকে রয়েছে। সময়মতো ফেরিতে পারাপার করতে না পারায় ট্রাকে থাকা তরমুজ পচে নষ্ট হচ্ছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
রোববার (৭ ডিসেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, ইলিশা লঞ্চঘাট এলাকা জুড়ে পচা তরমুজের তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ভোলা-বরিশাল-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভোলা অংশে ইলিশা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে তরমুজবোঝাই কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাক। অপেক্ষমাণ এসব গাড়ির প্রায় ৯৯ শতাংশেই তরমুজ রয়েছে।
ট্রাকচালকেরা জানান, ঘাটে একদিন আটকে থাকলেই তরমুজের বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি চালক ও সহকারীদের প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। লালমোহন থেকে তরমুজ নিয়ে আসা এক চালক মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) রাতে ঘাটে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু এখনো ফেরিতে ওঠার সুযোগ পাননি।
বোরহানউদ্দিন থেকে আসা ট্রাকচালক নীরব হাওলাদার অভিযোগ করেন, ইলিশা ঘাটে কোনো নির্দিষ্ট ট্রাক টার্মিনাল, বিশ্রামাগার বা শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। সড়কের ওপর গাড়ি রেখে অবস্থান করতে হয় এবং স্থানীয়দের নানা কথা শুনতে হয়। রাতের বেলায় গাড়ির ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জাম চুরি হওয়ার ঘটনাও ঘটে। কখনো ত্রিপল কেটে তরমুজও নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এর পরও টার্মিনাল খরচ হিসেবে ১৭০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চালকদের অভিযোগ, এই নৌপথে সারা বছরই নাব্যতা সংকট দেখা যায়। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে ফেরিতে যানবাহন পারাপার করতে হয়। এর সঙ্গে ফেরির স্বল্পতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক সময় একটি ফেরি চালু থাকলে অন্যটি বিকল হয়ে পড়ে থাকে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় প্রায় ৫০ হাজার একর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৮ হাজার একর বেশি। প্রতি একর জমিতে গড়ে প্রায় ১৫ হাজার কেজি তরমুজ উৎপাদন হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কৃষক মো. শাহাব উদ্দিন ফরাজি বলেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়া এবং সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টির কারণে বাজারে তরমুজের দাম কমে গেছে। আগে যেখানে ১০০টি তরমুজ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, এখন সেই দাম নেমে এসেছে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকায়। পরিবহন খরচই অনেক সময় উঠছে না, তার ওপর ফেরি সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ইলিশা ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক কাওসার আহমেদ জানান, আগে এই রুটে পাঁচটি ফেরি থাকলেও একটি বিকল হয়ে ডকইয়ার্ডে রয়েছে। তবে গৌরী নামের একটি বড় ফেরি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং আটকে থাকা যানবাহন দ্রুত পারাপার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের চাপও বেড়েছে। রোববার সকাল থেকে ইলিশা ঘাট থেকে ঢাকার সদরঘাটের উদ্দেশে একের পর এক লঞ্চ ছেড়ে গেছে। প্রতিটি লঞ্চেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি যাত্রী ছিল।
একই সময়ে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট ঘাটের উদ্দেশে ছয়টি নৌযান ছেড়ে গেলেও নৌযানের স্বল্পতার কারণে শত শত যাত্রীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে স্পিডবোটে করে উত্তাল মেঘনা নদী পার হতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
ঘাট–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ঈদের ছুটি শেষে হঠাৎ যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত লঞ্চ থাকায় দূরপাল্লার যাত্রীদের কিছুটা স্বস্তি মিলছে।
সিএ/এমই


