পৃথিবীর সব পিঁপড়াকে এক পাশে এবং সব মানুষকে অন্য পাশে দাঁড়িপাল্লায় তুললে দুই পক্ষের ওজন প্রায় সমান হবে—এমন ধারণা বহু বছর ধরে প্রচলিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। মানুষের মোট ভরের সমান না হলেও পৃথিবীর পিঁপড়াদের সম্মিলিত ভর যে কত বিশাল, তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানান, পৃথিবীতে পিঁপড়ার সংখ্যা প্রায় ২০ কোয়াড্রিলিয়ন। সংখ্যাটি ২-এর পর ১৬টি শূন্য নিয়ে গঠিত। গবেষণাটি পরিচালনার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে করা ৪৮৯টি পৃথক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এসব গবেষণায় নির্দিষ্ট এলাকায় প্রতি বর্গমিটারে কত পিঁপড়া রয়েছে, তা পরিমাপ করা হয়েছিল।
গবেষকেরা সেই ঘনত্বের তথ্যকে পৃথিবীর স্থলভাগের মোট আয়তনের সঙ্গে মিলিয়ে বৈশ্বিক হিসাব তৈরি করেন। শুধু মাটির ওপর নয়, গাছপালা, পাতার নিচে এবং মাটির গভীরে থাকা পিঁপড়ার আবাসস্থলও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বর্তমানে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি। সে হিসাবে প্রতিটি মানুষের বিপরীতে গড়ে প্রায় আড়াই লাখ পিঁপড়া রয়েছে।
পিঁপড়ার ২০ হাজারের বেশি প্রজাতি রয়েছে। কোনো কোনো প্রজাতির ওজন মাত্র ১ মিলিগ্রাম, আবার কিছু বড় প্রজাতির ওজন ১৫০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। গড় হিসাবে একটি পিঁপড়ার ওজন ধরা হয় প্রায় ২ থেকে ৩ মিলিগ্রাম।
তবে বিজ্ঞানীরা মোট ভর নির্ধারণে সরাসরি ওজনের পরিবর্তে কার্বন ভরের হিসাব ব্যবহার করেন। কারণ বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে পানির পরিমাণ ভিন্ন হলেও কার্বনের অনুপাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। একটি পিঁপড়ার শুকনো ভরের প্রায় অর্ধেকই কার্বন।
গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর সব পিঁপড়ার সম্মিলিত কার্বন ভর প্রায় ১২ মেগাটন বা ১ কোটি ২০ লাখ টন। অন্যদিকে ৮০০ কোটি মানুষের গড় ওজন ৬২ কেজি ধরে হিসাব করলে মানুষের মোট কার্বন ভর দাঁড়ায় প্রায় ৬০ মেগাটন।
এ হিসাবে মানুষের মোট ভর পিঁপড়ার তুলনায় অনেক বেশি। তবে পিঁপড়ার সম্মিলিত উপস্থিতি এখনো বিস্ময়কর। গবেষকেরা বলছেন, পৃথিবীর সব বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর সম্মিলিত ভরের চেয়েও পিঁপড়ার ভর বেশি। এমনকি সব বুনো পাখির মোট বায়োমাসকেও ছাড়িয়ে যায় পিঁপড়াদের সম্মিলিত ভর।
বিজ্ঞানীরা এই ধরনের তুলনায় ‘বায়োমাস’ ধারণা ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে কোনো প্রজাতির পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যে অবদান ও উপস্থিতির পরিমাণ নির্ণয় করা হয়।
পিঁপড়া শুধু সংখ্যায় বেশি নয়, পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মাটি খুঁড়ে বাতাস ও পানি চলাচলের পথ তৈরি করে, বীজ ছড়িয়ে গাছের বিস্তারে সাহায্য করে এবং মৃত পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখে।
প্রায় ১৪ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকা এই প্রাণীগুলো ডাইনোসরের যুগ থেকেও বর্তমান সময় পর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। মরুভূমি থেকে বৃষ্টিঅরণ্য—বিভিন্ন পরিবেশে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতাই তাদের সফলতার অন্যতম কারণ।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, একটি পিঁপড়া নিজের ওজনের ১০ থেকে ৫০ গুণ পর্যন্ত ভার বহন করতে পারে। মানুষের মধ্যে এমন শক্তি থাকলে একজন মানুষ অনায়াসে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি কাঁধে তুলে হাঁটতে পারতেন।
সূত্র: পিএনএএস গবেষণা
সিএ/এমআর


