পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল ও দুর্গম মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকায় পরিচালিত এক গবেষণা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মহাদেশটির গভীর বরফস্তরের নিচে স্থাপিত আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে বিজ্ঞানীরা নিউট্রিনো নামের অতি ক্ষুদ্র কণা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করছেন। গবেষকদের মতে, এই গবেষণা ভবিষ্যতে পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে এবং মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও গঠন সম্পর্কে নতুন তথ্য উন্মোচনে সহায়ক হতে পারে।
নিউট্রিনোকে অনেক সময় ‘ঘোস্ট পার্টিকেল’ বা ভৌতিক কণা বলা হয়। কারণ এদের ভর অত্যন্ত কম, কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই এবং তারা প্রায় আলোর গতিতে চলাচল করে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য নিউট্রিনো পৃথিবী ও মানুষের শরীর ভেদ করে চলে গেলেও সাধারণভাবে এগুলোর অস্তিত্ব অনুভব করা যায় না।
এই কণাগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় বিজ্ঞানীরা এমন একটি স্থান বেছে নিয়েছেন, যেখানে বাইরের বিকিরণ ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা কম। দক্ষিণ মেরুর বিশাল ও স্বচ্ছ বরফস্তর এ কাজে আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। তাই বরফের গভীরে হাজারো সেন্সর বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি।
দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে পরিচালিত এই গবেষণার সম্প্রসারণে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে নতুন প্রযুক্তি। গবেষণা ব্যবস্থায় প্রায় ৬০০ নতুন যন্ত্র সংযোজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিটেক্টর স্ট্রিংয়ের সংখ্যা ৮৬ থেকে বাড়িয়ে ৯২ করা হয়েছে। নতুন সেন্সরগুলোতে একাধিক ফটোসেন্সর যুক্ত থাকায় তথ্য সংগ্রহ আরও নির্ভুল হবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কয়েকটি অভিযানের মাধ্যমে বরফের গভীরে এসব যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, এই সম্প্রসারণের ফলে নিউট্রিনোর আচরণ সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা পাওয়া যাবে। বিশেষ করে নিউট্রিনো কীভাবে এক ধরনের অবস্থা থেকে অন্য ধরনের অবস্থায় রূপান্তরিত হয়, সেই প্রক্রিয়া বিশ্লেষণে নতুন তথ্য মিলতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় এ ঘটনাকে নিউট্রিনো অসিলেশন বলা হয়।
এ ছাড়া দূরবর্তী মহাকাশে নক্ষত্র বিস্ফোরণ থেকে আসা সংকেত শনাক্ত করা আরও সহজ হবে। মহাবিশ্বের শুরুর সময়কার অবস্থা সম্পর্কেও নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। গবেষণায় যদি ডার্ক ম্যাটার বা বর্তমান তত্ত্বের বাইরে কোনো নতুন কণার অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে তা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, নতুন প্রযুক্তির পাশাপাশি গত এক যুগের বেশি সময় ধরে সংগৃহীত তথ্যও পুনরায় বিশ্লেষণ করা হবে। উন্নত ক্যালিব্রেশন পদ্ধতির মাধ্যমে পুরোনো তথ্য থেকেও আরও নির্ভুল ফলাফল পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে পরিচালিত এই প্রকল্প শুধু একটি কণা শনাক্তকরণ গবেষণা নয়; বরং এটি মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্য অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা। ভবিষ্যতে এই গবেষণাই হয়তো মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও গঠন সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
সিএ/এমআর


