কৈশোর এমন একটি সময়, যখন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নতুন নতুন অনুভূতির জন্ম হয়। এ সময় কারও প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া, তাকে বিশেষভাবে ভাবা কিংবা তার সঙ্গে সময় কাটানোর আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে এই অনুভূতি বন্ধুত্বের গণ্ডি পেরিয়ে প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সে শরীরে হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে আবেগের তীব্রতা বেড়ে যায়। মস্তিষ্কে ডোপামিন, সেরোটোনিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তন কিশোর-কিশোরীদের অনুভূতি ও আচরণে প্রভাব ফেলে। এর ফলে বিপরীত লিঙ্গের কারও প্রতি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হতে পারে।
তবে সব টিনএজ সম্পর্কই পরিণত ভালোবাসার পর্যায়ে পৌঁছায় না। অনেক ক্ষেত্রে এটি সাময়িক ভালো লাগা বা ‘ক্রাশ’ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ভালোবাসার মধ্যে আবেগের পাশাপাশি দায়বদ্ধতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু কৈশোরের সম্পর্কে এসব উপাদান সব সময় সমানভাবে গড়ে ওঠে না।
এই বয়সে আবেগের ওঠানামাও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। সম্পর্কের কারণে যেমন আনন্দ তৈরি হতে পারে, তেমনি মতবিরোধ বা বিচ্ছেদ থেকে হতাশা, রাগ কিংবা মানসিক চাপও সৃষ্টি হতে পারে। তাই আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা অর্জন কিশোর-কিশোরীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
টিনএজ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একতরফা ভালোবাসা, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর মানসিক ভেঙে পড়া, ঈর্ষা, অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার, পরিবার থেকে দূরে সরে যাওয়া কিংবা পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোরে ব্যর্থতা মেনে নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সম্পর্কের জটিলতা কখনো কখনো মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে পরিবার, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সহায়ক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পারলে তাৎক্ষণিক রাগ বা শাস্তির পরিবর্তে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা উচিত। খোলামেলা আলোচনা, পড়াশোনার প্রতি উৎসাহ এবং মানসিক সমর্থন কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।
একই সঙ্গে অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার পর্যবেক্ষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক যৌন ও মানসিক শিক্ষা প্রদান এবং সন্তানের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তবে ভুল সিদ্ধান্তকে সমর্থন না করে সচেতনভাবে দিকনির্দেশনা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিক্ষকদেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বা প্রকাশ্যে বিব্রত না করে সংবেদনশীল আচরণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পারস্পরিক সম্মানবোধ, সামাজিক দক্ষতা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ালে তাদের মানসিক বিকাশ আরও ইতিবাচক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোরের আবেগকে অস্বীকার না করে তা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখানোই সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া ও সম্মতির ওপর।
সিএ/এমআর


