আমাদের দেশে অনেক দম্পতি পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, পরিকল্পিত গর্ভধারণই মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, মানসিক চাপ, দেরিতে বিয়ে এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে গর্ভধারণের আগে যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরিকল্পিত গর্ভধারণ বলতে শুধু সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়, বরং শারীরিক, মানসিক ও আর্থসামাজিক প্রস্তুতিকে বোঝায়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রি-কনসেপশন মেডিকেল চেকআপ, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো আগে থেকেই শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
চিকিৎসকদের মতে, গর্ভধারণের আগে মায়ের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি জানা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় সুস্থ একজন নারীও গর্ভধারণের পর নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড সমস্যা বা রক্তশূন্যতার মতো সমস্যা থাকলে তা গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি বাড়ায়। তবে আগে থেকেই চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
শিশুর সুস্থ বিকাশের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত গর্ভধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে শিশুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠিত হয়। এই সময় ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি থাকলে নিউরাল টিউব ডিফেক্টের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই গর্ভধারণের অন্তত তিন মাস আগে থেকেই ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরিকল্পিত গর্ভধারণের আরেকটি সুবিধা হলো ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ ব্যবহারের বিষয়টি আগে থেকেই বিবেচনায় আনা যায়। অনেকেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করেন, যেগুলোর কিছু গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর হতে পারে। পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব ওষুধ পরিবর্তন বা বন্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়।
মাতৃত্ব একজন নারীর জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। দাম্পত্য সম্পর্ক, কাজের চাপ এবং পারিবারিক দায়িত্বের বিষয়গুলো মাথায় রেখে মানসিক প্রস্তুতি নেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রি-কনসেপশন কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সাধারণত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রক্তের গ্রুপ ও আরএইচ ফ্যাক্টর, হিমোগ্লোবিন, রক্তের শর্করা, থাইরয়েড কার্যকারিতা, রুবেলা ইমিউনিটি, হেপাটাইটিস বি ও সি স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজন হলে আলট্রাসনোগ্রাফি।
গর্ভধারণের আগে জীবনযাপনে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি। সুষম খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানো—এসব বিষয় গর্ভধারণের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত স্থূলতা কিংবা খুব কম ওজন—দুই অবস্থাই গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু নির্দেশনা রয়েছে। বয়স যদি ৩৫ বছরের কম হয় এবং এক বছর চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আর বয়স ৩৫ বা তার বেশি হলে ছয় মাস চেষ্টা করেও সন্তান না হলে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া মাসিক অনিয়মিত হলে, আগে গর্ভপাত হয়ে থাকলে বা বন্ধ্যত্বের ইতিহাস থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর গুণগত মান কমে যেতে পারে। তাই সময়মতো পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। গর্ভধারণের আগে সুগার ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সিএ/এমআর


