মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক মহামারি কিংবা পারমাণবিক সংঘাতের মতো নানা শঙ্কা প্রায়ই আলোচনায় আসে। তবে একদল গণিতবিদ সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কেবল পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে মানবজাতির ভবিষ্যৎ টিকে থাকার সময়কাল নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্ব সর্বোচ্চ প্রায় ১৭ হাজার ১০০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এই ধারণার ভিত্তি কোনো পরিবেশগত বিপর্যয়, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা বা জীববৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নয়। বরং এটি সম্ভাব্যতার একটি গাণিতিক মডেল, যা ‘ডুমসডে আর্গুমেন্ট’ নামে পরিচিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে জন্ম নেওয়া মানুষের অবস্থানকে সামগ্রিক মানব ইতিহাসের একটি এলোমেলো বা র্যান্ডম অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ডুমসডে আর্গুমেন্টের ধারণাটি ১৯৮৩ সালে জ্যোতির্পদার্থবিদ ব্র্যান্ডন কার্টার উপস্থাপন করেন। এর ভিত্তি হলো ‘কোপারনিকান প্রিন্সিপল’। এই নীতিতে বলা হয়, মহাবিশ্বে পৃথিবীর যেমন কোনো বিশেষ অবস্থান নেই, তেমনি মানবসভ্যতার দীর্ঘ সময়রেখায় বর্তমান প্রজন্মও কোনো ব্যতিক্রমী অবস্থানে রয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
এই তত্ত্ব বোঝাতে গণিতবিদেরা একটি সহজ উদাহরণ ব্যবহার করেন। ধরা যাক, দুটি বাক্সের একটিতে ১০টি এবং অন্যটিতে এক লাখ নম্বরযুক্ত বল রয়েছে। যদি না দেখে একটি বল তুলে দেখা যায় তাতে ‘৪’ লেখা, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায় সেটি ছোট বাক্স থেকেই এসেছে। কারণ সেখানে এমন নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
একইভাবে পৃথিবীতে এ পর্যন্ত প্রায় ১১৭ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৭০০ কোটি মানুষের জন্ম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। যদি ভবিষ্যতে মানবজাতি ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মানুষের জন্ম দেয়, তাহলে বর্তমান প্রজন্মের এত শুরুতে অবস্থান করার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং তুলনামূলকভাবে সীমিত সংখ্যক মানুষের মধ্যেই বর্তমান প্রজন্মের অবস্থান হওয়াকে এই তত্ত্ব বেশি সম্ভাব্য বলে মনে করে।
গণিতবিদদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান প্রজন্ম মোট মানবজাতির প্রথম ৫ শতাংশের মধ্যে নয়—এমন সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ। সেই ভিত্তিতে ভবিষ্যতে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা বর্তমান পর্যন্ত জন্ম নেওয়া মানুষের প্রায় ২০ গুণের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ অতীত ও ভবিষ্যৎ মিলিয়ে মোট মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বে বছরে গড়ে প্রায় ১৩ কোটি শিশুর জন্ম হচ্ছে। এই হার দীর্ঘ সময় ধরে একই রকম থাকলে মোট সম্ভাব্য জনসংখ্যার সেই সীমায় পৌঁছাতে প্রায় ১৭ হাজার ১০০ বছর সময় লাগবে। যদিও ভবিষ্যতে জন্মহার বাড়তে বা কমতে পারে, ফলে এই সময়সীমাও কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
তবে এই তত্ত্ব নিয়ে বিজ্ঞানী সমাজে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, কেবল মানুষের জন্মসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সভ্যতার আয়ু নির্ধারণ করা যথেষ্ট নয়। পৃথিবীর প্রথম জীবাণু থেকে শুরু করে সব ধরনের প্রাণের ইতিহাস বিবেচনায় নিলে এই হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
আরেকটি মত হলো, মানুষ মাত্র সম্প্রতি এমন বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা অর্জন করেছে, যার মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই ধরনের বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে মানবসভ্যতা হয়তো এখনও বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে এবং ডুমসডে আর্গুমেন্টের অনুমান বাস্তবতার সঙ্গে নাও মিলতে পারে।
তাই ১৭ হাজার ১০০ বছরের এই হিসাবকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে তৈরি একটি গাণিতিক বিশ্লেষণ হিসেবেই দেখার পরামর্শ দেন গবেষকেরা। এটি মূলত মহাকালের বিশাল সময়রেখায় মানবজাতির অবস্থান নিয়ে নতুনভাবে ভাবার একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান
সিএ/এমআর


