মহাকাশের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অসীম অন্ধকার, দূরবর্তী নক্ষত্র আর রহস্যময় শূন্যতার ছবি। তবে মহাকাশের চেহারা নিয়ে কৌতূহলের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও অনেকের মনে জাগে—মহাকাশের কি কোনো গন্ধ আছে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, অবাক করার মতো হলেও মহাকাশের একটি স্বতন্ত্র ঘ্রাণ রয়েছে, যা পোড়া ধাতু, ওয়েল্ডিংয়ের ধোঁয়া, পোড়া মাংস এবং মিষ্টি ফলের গন্ধের মিশ্রণের মতো অনুভূত হয়।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই ঘ্রাণকে কৃত্রিমভাবে পুনর্নির্মাণ করে পৃথিবীতে সুগন্ধি হিসেবে বোতলজাত করার উদ্যোগও সফল হয়েছে। মহাকাশচারীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি এই বিশেষ সুগন্ধি এখন সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছেছে।
প্রকৃতপক্ষে মহাকাশ একটি বায়ুশূন্য পরিবেশ। ফলে সেখানে সরাসরি কোনো গন্ধ অনুভব করা সম্ভব নয়। তবে মহাকাশচারীরা যখন স্পেসওয়াক শেষে মহাকাশযানে ফিরে আসেন, তখন তাঁদের স্পেসস্যুট, গ্লাভস ও যন্ত্রপাতিতে লেগে থাকা বিভিন্ন কণা ও রাসায়নিক পদার্থ যানের অভ্যন্তরের বাতাসের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে একটি বিশেষ ধরনের গন্ধ তৈরি করে।
নাসার নভোচারী ডন পেটিট এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “এই গন্ধের বর্ণনা দেওয়া সত্যি কঠিন। এটি এমন কোনো সাধারণ খাবারের মতো নয় যে চট করে বলে দেওয়া যাবে এটির স্বাদ মুরগির মাংসের মতো। আমি সবচেয়ে কাছাকাছি এমন বর্ণনাটি দিতে পারি তা হলো, এটি একটি বেশ চমৎকার মিষ্টি ধাতব অনুভূতি। এটি আমাকে আমার কলেজের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আমি একটি আউটফিটের ভারী যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য আর্ক ওয়েল্ডিং টর্চ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতাম। মহাকাশের গন্ধটি ঠিক সেই ওয়েল্ডিংয়ের মিষ্টি ধোঁয়ার মতো।”
ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশনের জন্য নভোচারীদের প্রস্তুত করতে নাসা এমন একটি সুগন্ধি তৈরির পরিকল্পনা করে, যা প্রশিক্ষণের সময় মহাকাশের পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা দিতে পারে। এই দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ সুগন্ধি রসায়নবিদ স্টিভ পিয়ার্সকে।
নভোচারীদের বর্ণনা অনুযায়ী মহাকাশের গন্ধে বারুদ, পোড়া স্টেক, রাসবেরি এবং রামের মতো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেহেতু মহাকাশ থেকে সরাসরি কোনো ঘ্রাণ সংগ্রহ করা সম্ভব নয়, তাই স্টিভ পিয়ার্সকে সম্পূর্ণভাবে নভোচারীদের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে হয়। কয়েক বছরের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি ধোঁয়াটে, ধাতব, পোড়া এবং হালকা মিষ্টি ঘ্রাণের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ফর্মুলা তৈরি করেন।
প্রথমদিকে এটি কেবল নভোচারীদের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হলেও পরে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কারণে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা শুরু হয়। ফলে মহাকাশের অনুভূতির কাছাকাছি একটি অভিজ্ঞতা এখন পৃথিবীতেই পাওয়া সম্ভব।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাকাশের গন্ধের পেছনে বাস্তব বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও রয়েছে। স্পেনের আইআরএএম ৩০-মিটার রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে গবেষকেরা মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত স্যাজিটেরিয়াস বি২ নামের বিশাল আণবিক মেঘে ইথাইল ফরমেট নামের একটি রাসায়নিক যৌগ শনাক্ত করেছেন। পৃথিবীতে এই যৌগ রাসবেরির ঘ্রাণ ও ফলের স্বাদের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ ছাড়া মহাজাগতিক ধূলিমেঘে পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন নামের কার্বনসমৃদ্ধ যৌগের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। এসব যৌগ যখন মহাকাশযানের উপাদান এবং উচ্চশক্তির কণার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে, তখন তা পোড়া খাবার, ধোঁয়া কিংবা চারকোলের মতো গন্ধের অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাকাশের গন্ধ কোনো একক রাসায়নিক উপাদানের ফল নয়। বরং মহাকাশের তীব্র পরিবেশ, বিকিরণ, কণা এবং স্পেসস্যুটের উপাদানের মধ্যে সংঘটিত জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার সম্মিলিত ফলাফল এটি।
স্টিভ পিয়ার্সের এই উদ্যোগকে বিজ্ঞান ও রসায়নের এক অভিনব প্রয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে পৃথিবীতে বসেই সাধারণ মানুষ মহাকাশের এক ব্যতিক্রমী অনুভূতির কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
সিএ/এমআর


