জীবনের কিছু প্রাপ্তি অর্থ, সম্পদ কিংবা সামাজিক স্বীকৃতির চেয়েও অনেক বড় হয়ে ওঠে। কারও কাছে তা হতে পারে একটি সম্পর্কের পুনর্মিলন, কারও কাছে বহু বছরের অপেক্ষার অবসান। এক ব্যক্তির জীবনে এমনই এক আবেগঘন মুহূর্ত আসে ২৭ বছর বয়সে, যখন তিনি প্রথমবারের মতো তাঁর জন্মদাতাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারেন।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা এই তরুণের জন্মের আগেই তাঁর মা-বাবার দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যায়। পরে বিচ্ছেদের পর তাঁর বাবা বিদেশে চলে যান। জন্মের পর থেকে তিনি বড় হয়েছেন মামার বাড়িতে। বাবার পরিচয় জেনেছেন মায়ের কাছ থেকেই, কিন্তু বাস্তবে সেই সম্পর্ক কখনো গড়ে ওঠেনি।
শৈশব ও কৈশোরজুড়ে তিনি জানতেন, তাঁর বাবার বাড়ি খুব দূরে নয়। কিন্তু বাবার নতুন সংসার ছিল, আর বিভিন্ন সময় শুনতে হতো যে তিনি তাঁকে সন্তান হিসেবে স্বীকার করতে চান না। এই পরিস্থিতি তাঁর মনে গভীর কষ্ট তৈরি করেছিল।
সমবয়সী বন্ধুদের বাবার সঙ্গে সময় কাটাতে দেখা, আত্মীয়দের বাবার হাত ধরে চলতে দেখা কিংবা পারিবারিক মুহূর্তগুলোতে বাবার উপস্থিতি অনুভব করা—এসবই তাঁর মনে শূন্যতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। বিশেষ করে শৈশবের ১০ থেকে ১২ বছর বয়সের সময়টা ছিল সবচেয়ে কঠিন।
সময় গড়িয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পেয়েছেন, ঢাকায় কর্মজীবন শুরু করেছেন এবং নিজের পরিবারও গড়ে তুলেছেন। কিন্তু মনের ভেতরে একটি প্রশ্ন ও একটি আকাঙ্ক্ষা কখনো মুছে যায়নি—একবার বাবাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারার ইচ্ছা।
নিজের পরিচয়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে তিনি ২০২৪ সালের জুন মাসে লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম কার্যালয়ে আবেদন করেন। আদালতের নির্দেশে তাঁর মা, বাবা এবং তাঁর ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।
এ সময়ের মধ্যে তাঁর নিজের জীবনেও নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তিনি নিজেও বাবা হন। বর্তমানে তাঁর সন্তানের বয়স নয় মাস। নিজের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে, একজন শিশুর জীবনে বাবার উপস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তীতে আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয় যে তিনি যাঁকে নিজের বাবা বলে জানতেন, তিনিই তাঁর জৈবিক বাবা। এরপর আদালতের উদ্যোগে উভয় পক্ষকে ডাকা হয় এবং দীর্ঘদিনের জটিলতার অবসান ঘটে।
৯ জুন অনুষ্ঠিত সেই সাক্ষাতে বাবা তাঁকে নিজের সন্তান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেন। পাশাপাশি সম্পত্তিতে তাঁর অধিকার নিশ্চিত করা, ঘর নির্মাণের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং আত্মীয়স্বজনের সামনে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লিখিত অঙ্গীকারও করেন।
তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল স্বীকৃতি নয়, সম্পর্কের পুনর্জন্ম। বহু বছরের অপেক্ষার পর তিনি বাবার বুকে মাথা রাখার সুযোগ পেয়েছেন। জীবনে প্রথমবার বাবার স্নেহ ও উপস্থিতি অনুভব করেছেন কাছ থেকে।
সেই ঘটনার পর ঢাকায় ফিরে এলেও সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পরদিনই বাবার ফোন আসে। তাঁর শারীরিক অবস্থা, খাওয়া-দাওয়া, চাকরির খবর জানতে চান বাবা। এই খোঁজখবরই তাঁর কাছে ছিল এক নতুন অনুভূতি, যা আগে কখনো পাননি।
এখন তাঁদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। ফোনে কথা হয়, খোঁজখবর নেওয়া হয়। যে মানুষটিকে ২৭ বছর ধরে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারেননি, আজ তিনি সেই সম্পর্কের উষ্ণতা অনুভব করছেন নতুন করে।
এই পুনর্মিলনের পেছনে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তা, বিচারক এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
সিএ/এমআর


