শৈশবের স্মৃতিতে বাবার উপস্থিতি কখনো একজন অভিভাবক, কখনো শিক্ষক, আবার কখনো গল্পকার হয়ে ফিরে আসে। অনেক সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, তবে কিছু সম্পর্ক এমনভাবে রয়ে যায়, যা অনুপস্থিতির মধ্যেও নতুন অর্থ খুঁজে পায়। তাবাসসুম ইসলামের কাছে বাবার স্মৃতিও তেমনই এক দীর্ঘ যাত্রার অংশ।
শৈশবের প্রথম ২২ বছর তিনি বাবাকে দেখেছেন এক বিশাল ছায়াবৃক্ষ হিসেবে। এমন একজন মানুষ, যার ছায়ায় নিরাপত্তা, শিক্ষা, গল্প আর ভালোবাসা একসঙ্গে মিশে ছিল। সমাজবিজ্ঞান বইয়ের পাতা খুলে বসলে বাবা কখনো বনভূমির শ্রেণিবিন্যাস শেখাতেন, আবার কখনো গল্পের টানে চলে যেতেন নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিতে।
পড়ার টেবিলে বসে পাহাড়ি বন, শালবন কিংবা চা-বাগানের উদাহরণ শেখানোর সময় তিনি হঠাৎ গল্প শুরু করতেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দিনগুলো নিয়ে। কখনো চুয়েটের সবুজ পরিবেশ, কখনো চা-বাগানের আকাশমণি গাছ, আবার কখনো শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরি বন—সবকিছুই মিশে যেত তাঁর কথার ভুবনে।
পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞা হয়তো সব সময় মনে থাকেনি, কিন্তু কিছু শব্দ গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল মনে—ছায়াবৃক্ষ, আকাশমণি, সোনাঝুরি। সময়ের সঙ্গে সেই শব্দগুলো শুধু গাছ বা বনভূমির পরিচয় হয়ে থাকেনি, বরং বাবার স্মৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
লেখকের ভাষায়, তিনি নিজেকে ভাবতেন চা-গাছের মতো, আর তাঁর বাবা ছিলেন সেই আকাশমণি বা ছায়াবৃক্ষ, যিনি রোদ-বৃষ্টি থেকে আগলে রাখতেন। কিন্তু একসময় সেই ছায়াবৃক্ষ চিরবিশ্রামে চলে যায়।
বাবার মৃত্যুর পর জীবন যেন অন্য রূপ নেয়। চারপাশের পৃথিবীকে তখন অনেক বেশি কঠিন ও নির্মম মনে হতো। শূন্যতা, একাকিত্ব এবং হারানোর বেদনা দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে ঘিরে রেখেছিল।
এরপর একদিন ঢাকার বিজয় সরণিতে দীর্ঘ যানজটে আটকে ছিলেন তিনি। বাইরে ভ্যাপসা গরম, ক্লাসে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় হঠাৎ শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। চারপাশ ভরে যায় ভেজা মাটির গন্ধে।
অজান্তেই তাঁর মনে ভেসে ওঠে তিনটি শব্দ—ছায়াবৃক্ষ, আকাশমণি, সোনাঝুরি। সেই শব্দগুলোর হাত ধরে তিনি ফিরে যান শৈশবের স্মৃতিতে, বাবার গল্পে আর একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোতে।
সেদিনই তিনি উপলব্ধি করেন, মৃত্যু সব সম্পর্কের শেষ নয়। কিছু সম্পর্ক মৃত্যুর পরও নতুন রূপে বেঁচে থাকে। সময়ের সঙ্গে তাদের গতিপথ বদলায়, কিন্তু অস্তিত্ব মুছে যায় না।
তাঁর বিশ্বাস, বাবার সঙ্গে সম্পর্কের ধরন বদলে যাওয়ার সেই উপলব্ধি এসেছিল ঠিক ওই বৃষ্টিভেজা দিনেই। তখন থেকে অনুপস্থিতির বেদনার বদলে স্মৃতির ভেতরে বাবাকে খুঁজে পাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়।
আজও কোনো বৃষ্টি নামলে, কোনো চা-বাগানের কথা উঠলে কিংবা সোনাঝুরি বনের নাম শুনলে বাবার স্মৃতি ফিরে আসে। শুধু স্মৃতি নয়, ফিরে আসে গল্প, ইচ্ছে, স্বপ্ন আর একসঙ্গে ভাগ করে নেওয়া অসংখ্য মুহূর্ত।
লেখকের কাছে এখন বাবার সঙ্গে সম্পর্ক মানে উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির হিসাব নয়। বরং স্মৃতি, গল্প এবং অপূর্ণ ইচ্ছার এমন এক মানচিত্র, যেখানে যেকোনো সময় ফিরে যাওয়া যায়।
সেই মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে বই, গান, খাবার, প্রিয় মানুষ এবং শৈশবের অসংখ্য কথোপকথন। সেখানে বাবা আছেন এক অন্য রূপে—যিনি গল্পের মধ্য দিয়ে, স্মৃতির মধ্য দিয়ে এবং অনুভূতির মধ্য দিয়ে আজও জীবন্ত।
সিএ/এমআর


