বাবা দিবসকে ঘিরে অনেকেই নিজের জীবনের স্মৃতি ও অনুভূতির কথা তুলে ধরছেন। কারও কাছে বাবা শাসনের প্রতীক, কারও কাছে ভরসার আশ্রয়। আবার অনেকের শৈশবজুড়ে বাবাকে ঘিরে থাকে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দীকার জীবনেও বাবাকে ঘিরে রয়েছে এমনই এক ব্যতিক্রমী স্মৃতির গল্প।
জন্মের সময় তাঁর বাবা ছিলেন বিদেশে মিশনে। ফলে শৈশবের শুরুটা কেটেছে ছোট কাকুর স্নেহ ও আদরে। শিশুমনে বাবার যে ছবি তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে বাবাকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
মিশন শেষে উমরাহ পালন করে বাড়ি ফেরেন বাবা। গায়ে ছিল লম্বা সাদা আলখাল্লা-জোব্বা। ছোট্ট মেয়েটি তাঁকে দেখে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে চিৎকার করে উঠেছিল। এমনকি সেই ভয় থেকে জ্বরও এসেছিল বলে পরিবারের সদস্যরা পরে জানিয়েছেন।
এরপর বাবার প্রতি এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। তিনি ছুটিতে বাড়ি এলেও কাছে যাওয়া হতো না। দূর থেকে তাঁকে দেখতেন, কিন্তু সামনে যেতে সংকোচ বোধ করতেন। পরিবারের সবাই বলতেন, তিনি নাকি বাবাকে ভয় পান। তবে বড় হওয়ার পর উপলব্ধি হয়েছে, সেটি ভয় ছিল না; বরং দীর্ঘদিন দূরে থাকা একজন মানুষকে হঠাৎ করে আপন করে নিতে না পারার এক ধরনের দ্বিধা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দূরত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। চার বা পাঁচ বছর বয়সে বাবার আরেকটি ছুটির সময় সারাক্ষণ তাঁর আশপাশে ঘোরাফেরা করতেন তিনি। যদিও কোলে যাওয়া বা খুব কাছে দাঁড়ানোর সাহস তখনও হয়নি। তবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকতেন। কারণ তাঁর পকেটে থাকত প্রিয় মিল্ক ক্যান্ডি। ক্যান্ডির প্রতি আকর্ষণ আর বাবাকে জানার কৌতূহল—দুটোই সমানভাবে বেড়ে উঠছিল।
একসময় বাবার ছুটি শেষ হওয়ার দিন এসে যায়। সেদিন বাবাকে খুঁজে না পেয়ে দাদির কাছে গিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘জুজু লোকটা কোথায়?’ পরিবারের সবাই তখন হেসে উঠেছিলেন। দাদি বলেছিলেন, ‘বাবার কোলে তো যাস না, এত খোঁজ করছিস কেন?’ পরে জানা যায়, উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘কোলে যাব না। কিন্তু সামনে থাকবে, আমি দেখব।’
বছর পেরিয়ে আজ সেই স্মৃতিগুলো নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। যাকে একসময় ভয় পেতেন বলে মনে হতো, তাঁর উপস্থিতিই ধীরে ধীরে নিরাপত্তা ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা না থাকলেও সম্পর্কের গভীরতা তৈরি হয় নিঃশব্দে।
তাঁর জীবনে বাবার অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন ছোট কাকুও। যিনি শৈশবের বড় একটি সময় জুড়ে ছিলেন স্নেহ, ভালোবাসা ও আশ্রয়ের জায়গা। কিন্তু আজ তিনি আর বেঁচে নেই। তাঁর মৃত্যুর স্মৃতি এখনো হৃদয়ে গভীরভাবে রয়ে গেছে।
মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় হাসপাতালে শুয়ে ছোট কাকু বলেছিলেন, ‘আমাদের মিম ডাক্তার হবে, তখন আমার ট্রিটমেন্ট করবে।’ কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। লেখকের কাছে আজও এটি এক বেদনাময় স্মৃতি হয়ে আছে।
তিনি মনে করেন, জীবনের সবচেয়ে গভীর ভালোবাসাগুলোর অনেকটাই হয়তো প্রকাশ করা হয়ে ওঠে না। তবু প্রতিটি মোনাজাতে যখন পড়েন—‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা’—তখন তাঁর দুই বাবার মুখই ভেসে ওঠে। একজন এখনো জীবিত, আরেকজন চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাঁদের জন্যই তিনি দোয়া করেন, যেন আল্লাহ তাঁদের রহমত ও মাগফিরাতে আচ্ছাদিত রাখেন।
সিএ/এমআর


