আত্মীয়তার সম্পর্কে দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা কষ্টের ঘটনা নতুন নয়। অনেক সময় আপনজনের কাছ থেকেই মানুষ অবহেলা, অপবাদ, মানসিক আঘাত বা ক্ষতির মুখোমুখি হয়। তবে ইসলাম এমন পরিস্থিতিতেও আত্মীয়তার সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন না করে দায়িত্বশীল আচরণ বজায় রাখার শিক্ষা দেয়। ধর্মীয় দৃষ্টিতে আত্মীয়তা রক্ষা কেবল পারস্পরিক ভালো সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এক পক্ষ দায়িত্ব পালন না করলেও অন্য পক্ষের কর্তব্য অব্যাহত থাকে।
পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলো নষ্ট হওয়ার পেছনে নানা কারণ কাজ করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অন্যের সুখ-সমৃদ্ধি সহ্য করতে না পারা। ঈর্ষা ও হিংসা থেকে অনেকেই এমন আচরণ বা মন্তব্য করেন, যা আত্মীয়তার সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব তৈরি করে।
সম্পদ ও উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধও আত্মীয়তা ভাঙার বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। জমিজমা বা অর্থের হিসাবকে কেন্দ্র করে বহু পরিবারে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার বণ্টনে বৈষম্য বা প্রতারণার অভিযোগ সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবও সম্পর্ক নষ্টের অন্যতম কারণ। ‘আমি আগে কেন কথা বলব’ কিংবা ‘সে আগে আসুক’—এ ধরনের মানসিকতা দীর্ঘদিনের আন্তরিকতাকে নষ্ট করে দেয়। অথচ একটি সালাম, একটি ফোনকল বা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ অনেক দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারে।
গিবত, অপবাদ, কানকথা ও যাচাই ছাড়া অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিশ্বাস করাও পারিবারিক সম্পর্কে বিভক্তি সৃষ্টি করে। একইভাবে ‘সে আমার খোঁজ নেয়নি, আমিও নেব না’—এ ধরনের প্রতিশোধমূলক মানসিকতা আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল করে দেয়।
এ ছাড়া জীবনসঙ্গী বা শ্বশুরবাড়ির প্রভাবে নিজের পরিবারকে অবহেলা করা, আবার উল্টোভাবে নিজের পরিবারের প্রভাবে দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করা—উভয় পরিস্থিতিই সম্পর্কের অবনতির কারণ হতে পারে। লেনদেনে অসততা, দীর্ঘদিন যোগাযোগ না রাখা, অতিথিকে যথাযথ সম্মান না দেওয়া এবং সামাজিক বৈষম্য বা খোঁটা দেওয়ার প্রবণতাও আত্মীয়তার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ইসলাম ক্ষতিকর আত্মীয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখার শিক্ষা দিলেও নিজের ক্ষতির মধ্যে থাকার নির্দেশ দেয় না। কেউ যদি ধারাবাহিকভাবে মানসিক বা বাস্তব ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে সামাজিক বা মানসিকভাবে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখা এবং একটি সুস্থ সীমারেখা নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করে দেওয়াকে সমাধান হিসেবে উৎসাহিত করা হয়নি।
হাদিসে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)–এর কাছে অভিযোগ করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমার কিছু আত্মীয় আছে। আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখি, কিন্তু তারা সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমি তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করি, কিন্তু তারা আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। আমি তাদের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করি, কিন্তু তারা আমার প্রতি মূর্খতাসুলভ আচরণ করে।’
তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তুমি যেমন বলছ, যদি সত্যিই তেমন হয়ে থাকে, তবে যেন তুমি তাদের মুখে গরম ছাই ঢেলে দিচ্ছ। আর যতদিন তুমি এ অবস্থায় থাকবে, ততদিন তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার সঙ্গে একজন সাহায্যকারী থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৮)
আরেকটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত আত্মীয়তা রক্ষাকারী সে নয়, যে কেবল ভালো ব্যবহারের প্রতিদান দেয়। বরং প্রকৃত আত্মীয়তা রক্ষাকারী হলো সে, যার আত্মীয়রা সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯১)
দৈনন্দিন জীবনে আত্মীয়তার সম্পর্ক ধরে রাখতে বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। দেখা হলে সালাম দেওয়া, অসুস্থতার খবর নেওয়া, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো কিংবা একটি আন্তরিক বার্তা পাঠানোর মতো ছোট ছোট উদ্যোগও সম্পর্কের উষ্ণতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মব্যস্ততা বা ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে নিয়মিত দেখা না হলেও আত্মীয়তার সম্পর্ক সচেতনভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। ইসলাম আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ এবং পারিবারিক বন্ধনকে গুরুত্ব দিয়ে এ সম্পর্ক রক্ষার প্রতি উৎসাহিত করেছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় যে তার জীবিকা প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৫৬)
সিএ/এমআর


