বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে বায়ুমণ্ডলে সালফার ছড়িয়ে সূর্যের আলো আংশিক প্রতিফলিত করার একটি বিতর্কিত বৈজ্ঞানিক ধারণা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হলে তা শুধু পরিবেশগত বিতর্কই নয়, বিমানযাত্রী ও ক্রুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হতে পারে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রস্তাবিত এ প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বিজ্ঞানীদের আলোচনায় থাকা এই প্রযুক্তির নাম সৌর জিও–ইঞ্জিনিয়ারিং। এর অন্যতম পদ্ধতি হলো স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক অ্যারোসল ইনজেকশন। এতে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে সালফার ডাই–অক্সাইড গ্যাস ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে এই গ্যাস সালফেট অ্যারোসল তৈরি করে সূর্যের আলোর একটি অংশ মহাকাশে প্রতিফলিত করে, যার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।
গবেষকদের মতে, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর পৃথিবীর তাপমাত্রা সাময়িকভাবে কমে যাওয়ার যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া দেখা যায়, এই প্রযুক্তিও একই নীতিতে কাজ করবে। পূর্ববর্তী গবেষণায় ধারণা দেওয়া হয়েছে, মেরু অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন সালফার ডাই–অক্সাইড ছড়িয়ে দিলে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ০ দশমিক ৬ থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মেরু অঞ্চলে বিশেষভাবে পরিবর্তিত বিমান ব্যবহার করে এ ধরনের অ্যারোসল ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। কারণ, এসব অঞ্চলে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের উচ্চতা তুলনামূলক কম হওয়ায় সেখানে পৌঁছানো সহজ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, পরবর্তী সময়ে যাত্রীবাহী বিমান ওই অঞ্চল দিয়ে চলাচল করলে নতুন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আধুনিক বিমানের ইঞ্জিন বাইরের বাতাস টেনে নিয়ে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কেবিনে সরবরাহ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই বাতাসে থাকা সালফেট কণা বিমানের ভেতরে সালফিউরিক অ্যাসিডে রূপ নিতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অ্যাসিডের মাত্রা কম থাকলেও বিশেষ কিছু বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থায় কেবিনের বাতাসে সালফিউরিক অ্যাসিডের ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রামের বেশি হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পেশাগত এক্সপোজার নির্দেশিকা অনুযায়ী এই মাত্রা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উত্তর আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগকারী মেরু রুট ব্যবহারকারী বিমানগুলো এ ঝুঁকিতে বেশি পড়তে পারে। সালফিউরিক অ্যাসিডের সংস্পর্শে এলে শ্বাসনালিতে প্রদাহ, হাঁপানির আক্রমণ এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় বা বারবার এ ধরনের পরিবেশে থাকলে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন পাইলট ও কেবিন ক্রুরা, কারণ তাঁদের নিয়মিত এসব আকাশপথে দায়িত্ব পালন করতে হয়। গবেষকদের মতে, সৌর জিও–ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত প্রভাবের পাশাপাশি বিমান চলাচল ও জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকিও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
সিএ/এমআর


