হজরত মুসা (আ.) যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বার্তা নিয়ে ফেরাউন ও তার সভাসদদের সামনে উপস্থিত হন, তখন তিনি নিজের পরিচয় এমনভাবে তুলে ধরেন, যা ছিল তাওহিদের সুস্পষ্ট ঘোষণা এবং মানবসৃষ্ট ক্ষমতার দাবির সরাসরি প্রত্যাখ্যান। তিনি নিজেকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হিসেবে পরিচয় দেন এবং স্পষ্ট করে জানান, তিনি কেবল সত্যের বার্তাই পৌঁছে দিতে এসেছেন।
ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, সব নবী-রাসূলই মানুষের কাছে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান নিয়ে এসেছেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় মানুষ সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বিভিন্ন ধরনের শিরক, মূর্তিপূজা, সূর্য উপাসনা ও মানবসৃষ্ট বিশ্বাসব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফেরাউনের সময়ও সমাজে এমন বিভ্রান্তি ও অন্যায়ের বিস্তার ঘটেছিল।
সেই প্রেক্ষাপটে ফেরাউনের দরবারে মুসা (আ.)-এর বক্তব্য ছিল কেবল ধর্মীয় আহ্বান নয়, বরং আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করার অর্থ মানুষের ওপর মানুষের অন্যায় কর্তৃত্ব ও জুলুমকে অস্বীকার করা। এই সত্যকেই সামনে রেখে তিনি নিজেকে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের রাসূল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা সেই দৃশ্যপট তুলে ধরে বলেন, এবং মুসা বলল, হে ফেরাউন! আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন রাসূল। আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সত্য এসেছে, তা ছাড়া অন্য কিছু না বলার ব্যাপারে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছি; সুতরাং বনি ইসরাইলকে আমার সাথে যেতে দাও।
তাফসিরবিদ আল্লামা আবদুর রহমান আস-সাদী (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, মুসা (আ.) ফেরাউনকে জানিয়ে দেন যে তিনি এমন এক মহান সত্তার পক্ষ থেকে এসেছেন, যিনি আসমান-জমিন এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের একমাত্র প্রতিপালক। মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং আল্লাহর নামে মিথ্যা দাবি করা কোনো নবীর পক্ষে সম্ভব নয়।
মুসা (আ.) ফেরাউনের সঙ্গে কথা বলার সময় শিষ্টাচার বজায় রেখে তাকে তার উপাধি ধরে সম্বোধন করেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে তিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের রাসূল। এর মাধ্যমে তিনি ফেরাউনের দেবত্ব ও সর্বময় ক্ষমতার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং প্রকৃত মালিকানা যে একমাত্র আল্লাহর, সেই সত্য তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, আল্লাহর নামে তিনি কেবল সত্য কথাই বলবেন। নিজের দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি উল্লেখ করেন যে তিনি ফেরাউনের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে এসেছেন। একই সঙ্গে ‘তোমাদের রব’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ফেরাউনও আল্লাহরই সৃষ্টি এবং তারও একজন প্রকৃত প্রতিপালক রয়েছেন।
এরপর মুসা (আ.) তার মূল দাবি তুলে ধরে বলেন, বনি ইসরাইলকে মুক্ত করে তার সঙ্গে যেতে দিতে হবে। কারণ তারা আল্লাহর বান্দা এবং কোনো মানুষের দাসত্বে আবদ্ধ থাকার জন্য সৃষ্টি হয়নি। মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের মধ্যেই নিহিত—এই বার্তাই তিনি তুলে ধরেন।
মুসা (আ.)-এর এই বক্তব্যের তাৎপর্য ফেরাউন ও তার সভাসদরা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, এই আহ্বান গ্রহণ করলে ফেরাউনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার দাবি অস্বীকার না করে ফেরাউন তার নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে অলৌকিক নিদর্শন বা মুজিজা দেখতে চায়।
ফেরাউনের দরবারে নিজের পরিচয় উপস্থাপনের মাধ্যমে মুসা (আ.) স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, তিনি ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ পালন এবং মানুষের মুক্তির বার্তা পৌঁছে দিতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন রাসূল।
সিএ/এমআর


