দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে মুসলিমরা সংখ্যায় খুবই কম হলেও দেশটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় ৭৪ লাখ মানুষের এই দেশে মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক ১০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশেরও কম। তাদের বেশির ভাগই সুন্নি মুসলিম এবং পূর্বপুরুষদের অনেকেই সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিবাসী হিসেবে প্যারাগুয়েতে এসেছিলেন।
প্যারাগুয়েতে মুসলিমদের বড় অংশের বসবাস ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সীমান্তবর্তী বাণিজ্যনগরী সিউদাদ দেল এস্তেতে। ব্যবসা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই শহরেই দেশের প্রধান মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার এবং ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। রাজধানী আসুনিওনেও একটি ছোট মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে, যারা বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
রোমান ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন। ১৯৮৮ সালে আরব বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সংগঠিতভাবে ইসলামের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে মুসলিম কমিউনিটির বিস্তার ঘটলেও জাতীয় আদমশুমারিতে মুসলিমদের জন্য পৃথক কোনো শ্রেণি না থাকায় তাদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।
স্থানীয় মুসলিম নেতাদের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এই বৃদ্ধি মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা নতুন অভিবাসীদের কারণে। স্থানীয়দের ইসলাম গ্রহণের হার এখনও খুবই সীমিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পারিবারিক বা বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে ঘটে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৫৩০-এর দশকে স্প্যানিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার সময় দেশটিতে রোমান ক্যাথলিক ধর্মের আধিপত্য গড়ে ওঠে। এরপর বহু শতক ধরে ইসলামের কোনো উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে আসা অভিবাসীদের হাত ধরেই প্যারাগুয়েতে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভিত্তি তৈরি হয়।
বিশেষ করে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় দক্ষিণ লেবানন থেকে বহু শিয়া মুসলিম প্যারাগুয়েতে আশ্রয় নেন। এতে সিউদাদ দেল এস্তে অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায় এবং নতুন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
বর্তমানে সিউদাদ দেল এস্তের মেজকিতা দেল এস্তে দেশটির অন্যতম বড় মসজিদ ও ইসলামিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ২০১১ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়া এই মসজিদ ২০১৫ সালে উদ্বোধন করা হয়। রাজধানী আসুনিওনের সেন্ট্রো বেনিফিকো কালচারাল ইসলামিকো দে আসুনিওন প্রতিদিনের নামাজ, ইসলামিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং হালাল সনদ প্রদানের কাজ পরিচালনা করে। এছাড়া আল-জাহরা ইসলামিক কালচারাল সেন্টার শিয়া মুসলিমদের ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
দেশটিতে কোনো কেন্দ্রীয় মুসলিম নেতৃত্ব বা জাতীয় ইসলামিক কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে বিভিন্ন শহরের ইসলামিক সংগঠনগুলো নিজ নিজ উদ্যোগে মসজিদ পরিচালনা, ধর্মীয় শিক্ষা, হালাল সেবা এবং সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
দৈনন্দিন জীবনে মুসলিমরা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। রমজান মাসে ইফতার, তারাবিহ এবং ধর্মীয় আয়োজনকে ঘিরে মসজিদগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য বেড়ে যায়। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাও সীমিত পরিসরে হলেও ধর্মীয় মর্যাদার সঙ্গে উদযাপিত হয়। খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে বসবাস করলেও মুসলিমরা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ও সংস্কৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
শিক্ষার ক্ষেত্রে প্যারাগুয়েতে কোনো পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক বিদ্যালয় বা মাদ্রাসা নেই। তবে ইসলামিক সেন্টারগুলোতে আরবি ভাষা, কোরআন শিক্ষা এবং ইসলামের মৌলিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত ক্লাস পরিচালিত হয়। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহীদের কাছে দাওয়াহ কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। ধর্মীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৌদি আরবের ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সূত্র : গ্রোকিপিডিয়া
সিএ/এমআর


