Wednesday, July 22, 2026
27 C
Dhaka
No menu items!

যে কৌশলে মিসর বিজয় করেছিলেন সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)

মুসলিম ইতিহাসে সাহস, কূটনৈতিক দক্ষতা ও রণকৌশলের জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয় সাহাবি হজরত আমর ইবনুল আস (রা.)। মক্কার বনু সাহম গোত্রের সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই সাহাবি পরবর্তীতে ইসলামের অন্যতম সফল সেনাপতি ও মিসর বিজয়ের নায়ক হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

ধনী ব্যবসায়ী আস ইবন ওয়াইলের সন্তান আমর ইবনুল আস (রা.) শৈশব থেকেই বাগ্মিতা, নেতৃত্ব ও যুদ্ধকৌশলে দক্ষতা অর্জন করেন। অশ্বারোহণ, মরুভূমির কঠিন পরিবেশে চলাফেরা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাকে সমসাময়িক আরবদের মধ্যে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়। নানা দেশ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তার বিস্তৃত জ্ঞান পরবর্তী সময়ে সামরিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইসলাম গ্রহণের আগে কুরাইশরা তাকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত দূত হিসেবে ব্যবহার করত। এ কারণেই আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরতকারী মুসলমানদের ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তার ওপর। সঙ্গে ছিলেন উমারা ইবন ওয়ালিদ।

আবিসিনিয়ার ন্যায়পরায়ণ শাসক নাজ্জাশির সমর্থন আদায়ে কুরাইশদের পক্ষ থেকে মূল্যবান উপঢৌকন নিয়ে রাজদরবারে হাজির হন তিনি। এমনকি দরবারের ধর্মীয় নেতাদেরও নিজের পক্ষে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু মুসলমানদের প্রতিনিধি জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) ইসলামের বার্তা এমনভাবে তুলে ধরেন যে নাজ্জাশি ও উপস্থিত পাদ্রিরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এরপর নাজ্জাশি মুসলমানদের কুরাইশদের হাতে তুলে দিতে স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানান।

পরদিন আমর (রা.) নতুন কৌশল অবলম্বন করে নাজ্জাশিকে জানান, মুসলমানরা ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর বান্দা বলে। জবাবে জাফর (রা.) ইসলামের অবস্থান ব্যাখ্যা করলে নাজ্জাশি বলেন, তাদের বক্তব্যই সত্যের কাছাকাছি। ফলে আমরের প্রথম বড় কূটনৈতিক মিশন ব্যর্থ হয়।

হুদায়বিয়ার সন্ধির পর আবার আবিসিনিয়ায় গিয়ে আমরের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দূতকে হত্যার প্রস্তাব দেওয়ায় নাজ্জাশি তীব্রভাবে তাকে ভর্ৎসনা করেন এবং বলেন, যাঁর কাছে জিবরাইল (আ.) আসেন, তাঁর দূতের বিরুদ্ধে এমন কথা বলা যায় না। এই ঘটনার পর আমর সত্য উপলব্ধি করেন এবং নাজ্জাশির হাত ধরে ইসলাম গ্রহণ করেন।

মদিনায় যাওয়ার পথে তার সঙ্গে খালিদ ইবন ওয়ালিদ (রা.) ও উসমান ইবন আবি তালহার সাক্ষাৎ হয়। পরে তিনজনই মহানবী (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের ইসলাম গ্রহণে রাসুলুল্লাহ (সা.) আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।

ইসলাম গ্রহণের পর আমর ইবনুল আস (রা.) দ্রুত মুসলিম বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিতে পরিণত হন। ওমানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া, শাম অঞ্চলের যুদ্ধ, ফিলিস্তিন বিজয় এবং ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব মিসর বিজয়। খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে মাত্র চার হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি মিসর অভিমুখে অভিযান শুরু করেন। আল-আরিশ, আল-ফারমা ও উম্মে দনিন জয় করার পর বাবিলন দুর্গ অবরোধ করেন। পরে খলিফা ওমর (রা.) আরও চার হাজার সৈন্য পাঠান, যাদের মধ্যে জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) ও উবাদা ইবন সামিত (রা.)-এর মতো সাহাবিরা ছিলেন। দীর্ঘ অবরোধের পর রোমানদের প্রতিরোধ ভেঙে মিসর মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে।

বিজয়ের পর তিনি ফুস্তাত নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং আফ্রিকার প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে আমর ইবনুল আস’ নির্মাণ করেন। পাশাপাশি নীলনদ ও লোহিত সাগরের মধ্যকার প্রাচীন খাল পুনরুদ্ধার করে বাণিজ্য সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন। রোমান আমলের কঠোর করব্যবস্থা শিথিল করে কপ্টিক খ্রিস্টানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেন।

খলিফা উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর সিফফিনের যুদ্ধে তিনি মুয়াবিয়া (রা.)-এর পক্ষে অবস্থান নেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি বর্শার ডগায় কোরআন তুলে ধরে যুদ্ধবিরতি ও সালিশির আহ্বান জানান। পরে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে সালিশ অনুষ্ঠিত হয়। ইতিহাসে এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও বহু নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় রক্তপাত বন্ধ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জীবনের শেষভাগে আবারও মিসরের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আমর ইবনুল আস (রা.)। মৃত্যুশয্যায় তিনি আল্লাহর কাছে বিনয়ের সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং নিজের অপূর্ণতার কথা স্বীকার করেন।

পরবর্তীতে কায়রোর মোকাত্তাম পাহাড়ের পাদদেশে তাকে দাফন করা হয়। সামরিক নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য তিনি ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি হিসেবে আজও স্মরণীয়।

সিএ/এমআর

spot_img

আরও পড়ুন

জিকিরে বাড়ে মানসিক দৃঢ়তা, প্রশান্ত হয় হৃদয়

মানুষকে আল্লাহ তাআলা স্বভাবগতভাবেই দুর্বল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। শারীরিক...

চট্টগ্রামে বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি, পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখের বেশি মানুষ

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন...

২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে শরীরে কী ঘটে? জানালেন বিশেষজ্ঞরা

টানা ২৪ ঘণ্টা উপবাস বা না খেয়ে থাকা সাম্প্রতিক...

মানসিক চাপ কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বর্তমান ব্যস্ত জীবনযাত্রায় মানসিক চাপ অনেকের কাছেই নিত্যদিনের সঙ্গী।...

সিলেটে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করল উবার

অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবাকে আরও বিস্তৃত করতে সিলেটে পূর্ণাঙ্গ...

মহাকাশে আধিপত্যের নতুন প্রতিযোগিতা, মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

বিশ্বরাজনীতি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের পর এবার মহাকাশকে কেন্দ্র করে...

বাড়িতেই তৈরি করুন সুস্বাদু চিংড়ি সমুচা

বিকেলের নাস্তা, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় সমুচা জনপ্রিয়...

পাকা আম দিয়ে সহজেই তৈরি করুন সুস্বাদু পোয়া পিঠা

গ্রীষ্মের মৌসুমে পাকা আম দিয়ে নানা ধরনের মিষ্টান্ন ও...

৮১০০ এমএএইচ ব্যাটারির ভিভো ওয়াই৫০০ আসছে, এক চার্জে ৩৫ ঘণ্টা ভিডিও দেখার দাবি

বাংলাদেশের বাজারে নতুন ব্যাটারিকেন্দ্রিক স্মার্টফোন ‘ভিভো ওয়াই৫০০’ আনার ঘোষণা...

প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি, যেসব লক্ষণ ও করণীয় জানা জরুরি

তীব্র গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ...

র‍্যামের দাম কমেছে, বেড়েছে পোর্টেবল হার্ডডিস্কের মূল্য

চলতি সপ্তাহে ঢাকার কম্পিউটার বাজারে র‍্যামের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন...

অটোইমিউন রোগের যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়

বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ বিভিন্ন ধরনের অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হলেও...

বিত্তবান হয়েও কেন মানুষ অসুখী? অল্পে তুষ্টির শিক্ষা নিয়ে যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

শৈশবের একটি স্মৃতি তুলে ধরে বর্তমান সমাজে বৈষয়িকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা...
spot_img

আরও পড়ুন

জিকিরে বাড়ে মানসিক দৃঢ়তা, প্রশান্ত হয় হৃদয়

মানুষকে আল্লাহ তাআলা স্বভাবগতভাবেই দুর্বল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। শারীরিক দুর্বলতার পাশাপাশি মানসিক দুর্বলতাও মানুষের জীবনের একটি বাস্তবতা। দুঃখ, উদ্বেগ, সংকট কিংবা অনিশ্চয়তার মুহূর্তে মানুষ...

চট্টগ্রামে বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি, পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখের বেশি মানুষ

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ...

২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে শরীরে কী ঘটে? জানালেন বিশেষজ্ঞরা

টানা ২৪ ঘণ্টা উপবাস বা না খেয়ে থাকা সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে বেশ আলোচিত একটি অভ্যাস। অনেকেই মনে করেন, নির্দিষ্ট সময় খাবার থেকে...

মানসিক চাপ কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বর্তমান ব্যস্ত জীবনযাত্রায় মানসিক চাপ অনেকের কাছেই নিত্যদিনের সঙ্গী। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা ব্যক্তিগত নানা সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে...
spot_img