ডিজিটাল যুগে জীবনসঙ্গী খোঁজার পদ্ধতিতেও এসেছে পরিবর্তন। আগে যেখানে ঘটক, আত্মীয়স্বজন বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব আদান-প্রদান হতো, এখন অনলাইন ম্যাট্রিমনিয়াল প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন অ্যাপও অনেকের কাছে সম্ভাব্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে—অনলাইনে জীবনসঙ্গী খোঁজা ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য।
বাস্তব জীবনে অনলাইন পরিচয়ের মাধ্যমে সফল বৈবাহিক জীবনের যেমন উদাহরণ রয়েছে, তেমনি গোপন সম্পর্ক, পরিচয় গোপন করা বা মিথ্যা তথ্যের কারণে প্রতারণার ঘটনাও কম নয়। ফলে বিষয়টি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু মাধ্যম নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ইসলামি চিন্তাবিদরা।
ইসলামে বিয়েকে সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষদের বিয়ের ব্যবস্থা করো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩২)
এই নির্দেশনার মাধ্যমে পরিবার ও সমাজকে বিয়ের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে বর্তমান নগরজীবনে পারিবারিক যোগাযোগের পরিসর সীমিত হয়ে যাওয়ায় অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন। এ কারণে ম্যাট্রিমনিয়াল সেবা পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন ম্যাট্রিমনিয়াল প্ল্যাটফর্ম এবং ডেটিং অ্যাপকে একইভাবে দেখা উচিত নয়। ম্যাট্রিমনিয়াল প্ল্যাটফর্মের মূল উদ্দেশ্য বিয়ে এবং সেখানে সাধারণত পারিবারিক অংশগ্রহণ ও তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকে। অন্যদিকে ডেটিং অ্যাপের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, অনির্দিষ্ট সম্পর্ক এবং পরিবারের অনুপস্থিতি বেশি দেখা যায়।
ইসলামে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর একে অপরকে দেখার অনুমতি রয়েছে। নবীজি (সা.) এক সাহাবিকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কি তাকে দেখেছ?’ না শুনে বললেন, ‘দেখে নাও। এটা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা তৈরিতে সহায়ক হবে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩২৩৫)
তবে ইসলামি শিক্ষায় এই পরিচয় ও সাক্ষাৎ প্রকাশ্য এবং পারিবারিক অভিভাবকত্বের মধ্যে হওয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইসলামে ‘খালওয়াত’ বা অপরিচিত নারী-পুরুষের নির্জনে অবস্থান নিষিদ্ধ। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে না থাকে—তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৩৩)
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সময়ে গভীর রাতে গোপন চ্যাট, ব্যক্তিগত ভিডিও কল কিংবা পরিবারের অজান্তে দীর্ঘ সময় যোগাযোগকে অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ ডিজিটাল খালওয়াত হিসেবে বিবেচনা করেন। এ ধরনের গোপন যোগাযোগ আবেগীয় আসক্তি তৈরি করতে পারে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিচয়ের সত্যতা যাচাই। অনেক ক্ষেত্রে প্রোফাইলে ছবি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা কিংবা পারিবারিক তথ্য অতিরঞ্জিত বা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। ইসলামে প্রতারণাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)
ফিকহবিদ ইমাম ইবনে কুদামা উল্লেখ করেছেন, ‘বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষ যদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে বা মিথ্যা বলে, তবে অপর পক্ষের চুক্তি বাতিলের অধিকার থাকে।’ (ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ৯/৪৬৩, কায়রো)
জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ইসলামে চরিত্র ও ধার্মিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নারীকে সাধারণত চারটি কারণে বিয়ে করা হয়—সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও ধার্মিকতা। তুমি ধর্মভীরু নারী লাভ করে সফল হও। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৯০)
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই একই নীতি পুরুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অথচ অনেক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রথমেই বাহ্যিক ছবি ও আকর্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, চরিত্র, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশীলনের বিষয়গুলো পরে আসে।
সার্বিকভাবে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, অনলাইনে জীবনসঙ্গী খোঁজা নিজেই নিষিদ্ধ নয়। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি যদি সততা, পারিবারিক অংশগ্রহণ, স্পষ্ট বৈবাহিক উদ্দেশ্য এবং ইসলামি নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হয়, তাহলে মাধ্যম অনলাইন হলেও আপত্তির কারণ থাকে না। আপত্তি তৈরি হয় গোপন সম্পর্ক, প্রতারণা এবং অনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে।
সিএ/এমআর


