প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের ধরন আমূল বদলে গেছে। একসময় বন্ধুত্ব গড়ে উঠত দীর্ঘ পরিচয়, পারস্পরিক বিশ্বাস ও একসঙ্গে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে কয়েক সেকেন্ডেই নতুন সম্পর্কের সূচনা হয়। একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, একটি ফলো কিংবা কয়েকটি বার্তার মাধ্যমেই তৈরি হয় পরিচয়। তবে ইসলাম মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত বন্ধুত্ব কেবল পরিচয়ের ওপর নয়, বরং চরিত্র, বিশ্বস্ততা ও নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক। পরিবার তার প্রথম আশ্রয় হলেও জীবনের পথে বন্ধু হয়ে ওঠে চিন্তা, চরিত্র ও জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রী। তাই ইসলাম বন্ধুত্বকে কেবল সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে নয়, বরং একজন মানুষের ঈমান, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে।
ডিজিটাল যুগ মানুষের যোগাযোগ সহজ করেছে, বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তেই সংযোগ স্থাপন সম্ভব হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি সম্পর্কের গভীরতা অনেক ক্ষেত্রেই কমে এসেছে। বাস্তব জীবনের দীর্ঘ পরিচয়, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার যে প্রক্রিয়া ছিল, ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের ক্ষেত্রে তা অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।
এখন অনেকেই লেখক, বক্তা, খেলোয়াড় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের নিয়মিত অনুসরণ করেন। তাঁদের লেখা, ছবি ও মতামত মানুষের চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ফলে কাদের অনুসরণ করা হচ্ছে, কোন ধরনের কনটেন্ট দেখা হচ্ছে এবং কার কাছ থেকে মূল্যবোধ গ্রহণ করা হচ্ছে, সেটিও আজ বন্ধুত্ব নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেন, ‘সৎ ও অসৎ বন্ধুর উদাহরণ আতর বিক্রেতা ও কামারের মতো। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে হয় তুমি আতর পাবে, নয়তো অন্তত তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কামারের কাছে গেলে হয় তোমার কাপড় পুড়ে যাবে, নয়তো দুর্গন্ধে আক্রান্ত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১০১)
এই হাদিসের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, মানুষের সঙ্গ কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। সৎ মানুষের সংস্পর্শ ভালো চরিত্র গঠনে সহায়তা করে, আর অসৎ সঙ্গ ধীরে ধীরে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
আরেকটি হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম (স্বভাব ও জীবনাচার) এর ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৭)
আধুনিক মনোবিজ্ঞানও বলছে, মানুষ যাদের সঙ্গে বেশি সময় কাটায়, তাদের চিন্তা, ভাষা, অভ্যাস ও মূল্যবোধ ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে গ্রহণ করতে শুরু করে। তাই অনলাইন কিংবা অফলাইন—উভয় ক্ষেত্রেই সঙ্গ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত যোগাযোগের ভ্রম। শত শত মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ হলেও অনেক সময় পরিবার, আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রকৃত বন্ধুদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয় না। একই ঘরে থেকেও সবাই নিজ নিজ ডিভাইসে ব্যস্ত থাকায় বাস্তব সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যেতে পারে।
ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা খুব দ্রুত গড়ে ওঠে এবং অনেক সময় খুব দ্রুত ভেঙেও যায়। একটি ক্লিকেই আনফ্রেন্ড, ব্লক কিংবা আনফলো করার সুযোগ থাকায় সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মানসিকতা দুর্বল হতে পারে।
ইসলাম সম্পর্কে ভারসাম্য বজায় রাখার শিক্ষা দেয়। আলী ইবন আবি তালিব (রা.) বলেন, ‘তোমার বন্ধুকে পরিমিতভাবে ভালোবাসো। কারণ, একদিন সে তোমার শত্রু হতে পারে। আর শত্রুকেও পরিমিতভাবে ঘৃণা করো। কারণ, একদিন সে তোমার বন্ধু হতে পারে।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ২৩৩৬)
একইভাবে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, ‘তোমাদের ভালোবাসা যেন নির্বুদ্ধিতায় পরিণত না হয় এবং তোমাদের ঘৃণা যেন ধ্বংসাত্মক না হয়।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১৩৩৬)
বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত তথ্য ও আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। একটি স্ক্রিনশট বা একটি পোস্ট মুহূর্তেই অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু প্রকাশের আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে চিন্তা করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও মানসিক অশান্তির কারণ হতে পারে। বাস্তবে প্রত্যেক মানুষের জীবনেই সুখ ও দুঃখ পাশাপাশি থাকে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা দৃশ্যের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনকে তুলনা করা সমীচীন নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল পরিচয়ের ভিত্তিতে দ্রুত বিশ্বাস স্থাপন করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রকৃত বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সম্পর্ক, সততা, ত্যাগ এবং পারস্পরিক আস্থা।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এমন সব পেজ, আইডি বা কনটেন্ট থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেগুলো মানুষের মনে ঈর্ষা, হতাশা, অশ্লীলতা কিংবা গিবতের প্রবণতা সৃষ্টি করে। প্রয়োজন হলে আনফলো, মিউট কিংবা ব্লক করার মধ্যেও আত্মরক্ষার শিক্ষা রয়েছে।
একই সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ককে সময় দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেওয়া, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা এবং বিপদে পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয় বহন করে।
প্রযুক্তি মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত। তবে সেটির ব্যবহার হতে হবে নৈতিকতা, শালীনতা ও ইসলামের আদর্শের আলোকে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম বদলালেও প্রকৃত বন্ধুত্বের ভিত্তি হিসেবে সততা, বিশ্বস্ততা, ভারসাম্য ও কল্যাণকামিতার গুরুত্ব কখনো কমে না।
সিএ/এমআর


