তীব্র গরম এবং বিদ্যুতের ঘাটতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও, হামলা এবং কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি, ঢাকা, নেত্রকোনা, শেরপুর, সিলেট ও রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, সারা দেশে উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়েই বিভিন্ন এলাকায় পালাক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় উত্তেজিত একদল মানুষ পল্লী বিদ্যুতের জোনাল কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্ধশতাধিক ব্যক্তি কার্যালয়ে এসে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে ভবনের কয়েকটি জানালার কাচ ভেঙে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও স্থানীয়রা এগিয়ে আসে।
কেন্দুয়া পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. ওমর ফারুক জানান, উপজেলায় প্রায় ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ ছিল মাত্র ৭ মেগাওয়াট। এই ঘাটতির কারণেই সব ফিডারে বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হয়নি। হামলার ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জামুর্কীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে গ্রাহকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের আশ্বাসের পর আন্দোলনকারীরা অবরোধ তুলে নেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের ঘাটতির বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। ফলে তাঁরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে নাগরপুর ও দেলদুয়ার এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের বড় ব্যবধান তুলে ধরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঢাকার দোহারে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল ও লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে গ্রাহকেরা পল্লী বিদ্যুতের আঞ্চলিক কার্যালয় ঘেরাও এবং মানববন্ধন করেন। কিছু সময়ের জন্য ঢাকা-দোহার সড়কেও যান চলাচল ব্যাহত হয়। আন্দোলনকারীরা ভুতুড়ে বিলের অভিযোগ তুলে দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।
দোহার পল্লী বিদ্যুতের উপমহাব্যবস্থাপক মো. বাদল মিয়া বলেন, মিটারের রিডিং অনুযায়ী বিল তৈরি করা হয়। অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ পেলে তা যাচাই করা হবে। তিনি জানান, বিদ্যুতের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় লোডশেডিং এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
শেরপুরে বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানান, জেলার পাঁচ উপজেলায় প্রায় ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩৫ মেগাওয়াট। এই ঘাটতির কারণেই পালাক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে একদল ব্যক্তি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে প্রবেশ করে কর্মরত লাইনম্যানকে খুঁজতে থাকে এবং বাইরে থাকা ৩৩ কেভি অটোমেটিক সার্কিট রিক্লোজার বন্ধ করে দিলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ নেওয়া হয়।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানান, এলাকায় প্রায় ৪৫ হাজার গ্রাহকের জন্য পিক আওয়ারে ১১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াট।
ঝালকাঠিতে গ্রাহকেরা লোডশেডিং, ভুতুড়ে বিল ও বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন। বক্তারা অভিযোগ করেন, দিনের পর দিন বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে লোডশেডিং করা ছাড়া বিকল্প নেই।
রাজশাহীর বাগমারায় লোডশেডিং বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর সময় পল্লী বিদ্যুতের একটি প্রচারগাড়ি স্থানীয় বাসিন্দারা আটকে দেন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে গাড়িটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তীব্র গরম এবং বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়ে যাওয়ায় সংকট প্রকট হয়েছে। সরকারকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বরাদ্দের জন্যও আবেদন করা হয়েছে।
সিএ/এমআর


