জীবনের নানা পর্যায়ে এমন সময় আসে, যখন দায়িত্বের চাপ মানুষের কাছে অসহনীয় মনে হতে পারে। অসুস্থ স্বজনের সেবা, সন্তান লালন-পালন, কিংবা একসঙ্গে চাকরি, পড়াশোনা ও সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে বার্নআউট, উদ্বেগ ও মানসিক অবসাদও দেখা দিতে পারে।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে এই কঠিন সময়গুলো শুধু ধৈর্যের পরীক্ষা নয়, বরং ইবাদতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করার মাধ্যমে এসব চাপকে অর্থবহভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব বলে ধর্মীয় শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রথমত, প্রতিটি দায়িত্বের পেছনে নিয়তকে বিশুদ্ধ রাখা জরুরি। দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একঘেয়েমি বা ক্লান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এই দায়িত্বকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করলে তা মানসিক প্রশান্তি এনে দিতে পারে। অতীতের আফসোস বা ভবিষ্যতের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার পরিবর্তে বর্তমান মুহূর্তে নিজের করণীয়ের ওপর মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হতে পারে যা তোমরা অপছন্দ করছ, তা–ই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আর যা পছন্দ করছ, তা ক্ষতিকর—আল্লাহই ভালো জানেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২১৬)
দ্বিতীয়ত, কঠিন সময়ে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি সংকটে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সন্তুষ্টির জন্য দোয়া করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখার শিক্ষা ইসলাম দেয়।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমার কর্মসাধন আল্লাহরই সাহায্যে। আমি তাঁরই ওপর ভরসা করি।’ (সুরা হুদ, আয়াত ৮৮)
মানসিক চাপ বেড়ে গেলে নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নিজের কষ্ট তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘আমার বান্দা যখন আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, (বলুন,) নিশ্চয় আমি খুব কাছে। কেউ ডাকলে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)
তৃতীয়ত, নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া এবং আত্মযত্নকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, বিশ্রাম ও নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বিলাসিতা নয়, বরং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়োজনীয় উপাদান।
একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে পরিবার বা স্বজনদের কাছ থেকে সহায়তা নেওয়া এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কাজের তালিকা তৈরি করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ওপর তোমার প্রতিপালকের অধিকার আছে, তোমার নিজের অধিকার আছে, তোমার পরিবারের অধিকার আছে—প্রত্যেকের প্রাপ্য তাকে দিয়ে দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৯)
ধর্মীয় আলোচনায় আরও বলা হয়েছে, জীবনের একটি কঠিন সময়কে পুরো জীবনের পরিচয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটিকে একটি সাময়িক অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করে অন্যান্য দায়িত্ব ও সম্পর্কের জন্যও সময় বের করা প্রয়োজন। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, পরিবেশ পরিবর্তন কিংবা কিছু সময় বিশ্রাম নেওয়াও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
মাথার ভেতর জমে থাকা কাজগুলো লিখে কোনটি এখন করতে হবে, কোনটি পরে করা যাবে এবং কোনটি বাদ দেওয়া সম্ভব—এভাবে ভাগ করে নিলে চাপ অনেকটাই কমে আসে।
শেষ পর্যন্ত ইসলামের শিক্ষা হলো, অন্য মানুষের কষ্ট লাঘব করা ও দায়িত্ব পালনও একটি দীর্ঘমেয়াদি ইবাদত। মানুষ না দেখলেও আল্লাহ প্রতিটি প্রচেষ্টা দেখছেন এবং তার প্রতিদান সংরক্ষণ করছেন।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন পুরো মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত ৩২)
সিএ/এমআর


