রাঙামাটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে সীমিত সামর্থ্য আর অসংখ্য প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও একের পর এক নারী ফুটবলার গড়ে তুলছেন কোচ শান্তিমনি চাকমা। কোনো নির্দিষ্ট বেতন ছাড়াই বছরের পর বছর নিজের শ্রম, সময় ও ব্যক্তিগত আয়ের ওপর ভর করে তিনি পাহাড়ি জনপদের মেয়েদের জাতীয় পর্যায়ের ফুটবলে তুলে আনছেন। বাংলাদেশ নারী ফুটবলের সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে তাঁর অবদান এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প।
এই যাত্রার শুরু ২০১১ সালের দিকে। মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীর সেন চাকমা একদিন শান্তিমনি চাকমাকে বলেন, ‘একটা বালিকা ফুটবল দল গড়ে তোল।’
এই একটি আহ্বানই বদলে দেয় শান্তিমনির জীবনের পথচলা। খেলাধুলার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে তিনি নিজে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার সুযোগ পাননি। সেই অপূর্ণ স্বপ্নই তিনি পাহাড়ের মেয়েদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর বীর সেন চাকমাকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ঘুরে ফুটবল খেলার আগ্রহী মেয়েদের খুঁজতে শুরু করেন তিনি। তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। সে সময় মেয়েদের ফুটবল খেলাকে অনেক পরিবার ভালোভাবে নিত না। অভিভাবকদের রাজি করানো, খেলোয়াড় সংগ্রহ এবং অনুশীলনের পরিবেশ তৈরি—সবকিছুই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
অবশেষে ১৭ জন মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় যাত্রা। তাদের থাকার জন্য ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত একটি ভবনে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। সকাল-বিকেল নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটি প্রতিযোগিতামূলক দল।
পরিশ্রমের ফলও আসে দ্রুত। ২০১২ সালে মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দল জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। পরে খেলোয়াড়রা মাধ্যমিকে উঠলে দল ভেঙে না যায়, সে জন্য তাঁদের ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেন শান্তিমনি চাকমা ও বীর সেন চাকমা।
শুরুর দিনগুলোর আর্থিক সংকট ছিল প্রকট। খেলোয়াড়দের জন্য নতুন বুট কেনার সামর্থ্য ছিল না। অনেক সময় পুরোনো ও ছেঁড়া বুট মেরামত করেই অনুশীলন চালাতে হয়েছে। এমনকি অনেক দিন খেলোয়াড়দের জন্য ন্যূনতম নাশতার ব্যবস্থাও করা সম্ভব হয়নি।
শান্তিমনি চাকমা বলেন, ‘একজন ফুটবলারের শরীর ঠিক রাখতে ভালো খাবার লাগে। সেটা দিতে না পারাটা আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট।’
অভাব-অনটন সত্ত্বেও সাফল্যের ধারা থেমে থাকেনি। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার জাতীয় স্কুল ফুটবলে রানার্সআপ হয় দলটি। এরপর ২০১৬ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। পরবর্তী বছরগুলোতেও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ঘাগড়ার মেয়েরা ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখে।
বর্তমানে বাংলাদেশ নারী ফুটবলের পরিচিত মুখ ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, রুপনা চাকমা, আনাই মগিনী ও আনু মগিনীর ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুর পেছনেও রয়েছে শান্তিমনি চাকমার দীর্ঘদিনের নিবেদিত পরিশ্রম। প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা থেকে জাতীয় দলের জার্সি পর্যন্ত তাঁদের পৌঁছে দেওয়ার পথে তিনি ছিলেন অন্যতম পথপ্রদর্শক।
নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের কথা স্মরণ করে শান্তিমনি বলেন, ‘নিজে খেলতে পারিনি। টাকার অভাবে স্বপ্নটা মাঝপথেই থেমে গিয়েছিল। তখনই ঠিক করেছিলাম, আমার না-পারা স্বপ্নটা পাহাড়ের মেয়েদের দিয়ে পূরণ করব।’
আজও তাঁর কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই। আগে ছোটখাটো ব্যবসা করলেও বর্তমানে পাহাড়ে হলুদ ও আদার চাষ থেকে যে আয় হয়, তা দিয়েই সংসারের পাশাপাশি ফুটবল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁকে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। চার বছর আগে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কে দুর্ঘটনায় তাঁর বড় মেয়ে, নৃত্যশিল্পী শিল্পা চাকমার মৃত্যু হয়। সেই শোক এখনও বয়ে বেড়ালেও তিনি মাঠ ছেড়ে যাননি। বরং নতুন উদ্যমে খেলোয়াড় তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ফুটবলের পাশাপাশি পাহাড়ে সেপাক তাকরা খেলাটিও জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন শান্তিমনি চাকমা। তাঁর প্রশিক্ষণে ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি নেপাল ও থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছে।
২০১৬ সালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় একটি আবাসিক হোস্টেল নির্মিত হয়। বর্তমানে সেখানে ২৬ জন কিশোরী নিয়মিত থেকে ফুটবল অনুশীলন করছে। খেলোয়াড়দের অসুস্থতা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে অনেক ক্ষেত্রেই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা করেন তিনি।
বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সাফল্যে তাঁর পাঁচজন শিষ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই অর্জনের স্মৃতি এখনও তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।
শান্তিমনি বলেন, ‘জীবনে অনেক আনন্দ পেয়েছি, কিন্তু ওই দিনের মতো সুখ আর কখনো পাইনি।’
অর্থসংকট, ব্যক্তিগত শোক ও নানা অবহেলা সত্ত্বেও তিনি এখনও প্রতিদিন মাঠে যান নতুন প্রতিভা খুঁজতে। ভবিষ্যতেও এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যত দিন বেঁচে আছি, হাল ছাড়ব না। সহযোগিতা করুক বা না করুক, খেলোয়াড় তৈরির কাজ চালিয়ে যাব।’
তাঁর বিশ্বাস, পাহাড়ের কোনো না কোনো গ্রামে এখনও লুকিয়ে আছে নতুন ঋতুপর্ণা, নতুন মনিকা। প্রয়োজন শুধু তাঁদের খুঁজে বের করে সঠিক সুযোগ করে দেওয়া।
সিএ/এমআর


