অনেক প্রতিষ্ঠানে মালিক থেকে শুরু করে অধিকাংশ কর্মী মুসলিম হলেও কর্মপরিবেশে ইসলামী মূল্যবোধের বাস্তব প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। অফিসে নামাজের ব্যবস্থা, আজানের ধ্বনি কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে কোরআন তেলাওয়াত থাকলেও ব্যবস্থাপনা, সময় বণ্টন, কর্মসংস্কৃতি ও সাফল্যের মানদণ্ড অনেক ক্ষেত্রেই এমন ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যা ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। এর পেছনে নির্মাতার চিন্তা ও বিশ্বাস কাজ করে। সেই বিশ্বাস যদি মানুষকে কেবল উৎপাদনের একটি উপকরণ হিসেবে দেখে, তাহলে কর্মীর মর্যাদা সংকুচিত হয়ে যায়। অথচ ইসলাম মানুষকে আল্লাহর সম্মানিত সৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে একজন কর্মীকে কেবল ‘হিউম্যান রিসোর্স’ নয়, বরং আল্লাহর অর্পিত একটি আমানত হিসেবে দেখার শিক্ষা দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের শেষ সময়ে ইউরোপীয় অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলানোর প্রবণতা মুসলিম সমাজের কর্মসংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ধীরে ধীরে উৎপাদনশীলতাই প্রধান মানদণ্ডে পরিণত হয় এবং আল্লাহর ওপর ভরসা, অল্পে সন্তুষ্টি কিংবা আত্মিক ভারসাম্যের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। সেই ধারা আজও বিভিন্ন মুসলিম সমাজের প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রভাব ফেলছে।
সমস্যা পশ্চিমা জ্ঞান গ্রহণে নয়; বরং তা নিজস্ব মূল্যবোধের আলোকে যাচাই না করেই গ্রহণ করায়। ইতিহাসে মুসলিম মনীষীরা গ্রিক দর্শন ও জ্ঞানকে সরাসরি অনুসরণ করেননি। বরং তা বিশ্লেষণ করে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নতুন রূপ দিয়েছিলেন।
একইভাবে বর্তমান কর্মঘণ্টার প্রচলিত ৯টা থেকে ৫টার কাঠামো শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী ইউরোপীয় বাস্তবতায় তৈরি। অথচ একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হওয়ার কথা। তাই কর্মপরিকল্পনাতেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
কর্মীকে যদি আল্লাহর দেওয়া আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে নিয়োগ, কর্মপরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা এবং ছাঁটাই—সব ক্ষেত্রেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসে। তখন প্রতিষ্ঠান শুধু মুনাফা অর্জনের জায়গা থাকে না; বরং মানুষের হালাল জীবিকা নিশ্চিত করার একটি দায়িত্বশীল মাধ্যম হয়ে ওঠে, যার জবাবদিহি একদিন আল্লাহর কাছেও করতে হবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। কর্মঘণ্টা যেন নামাজের সময়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, মুনাফার পাশাপাশি বারাকাহকে গুরুত্ব দেওয়া, নেতৃত্বকে কর্তৃত্ব নয় বরং সেবার দায়িত্ব হিসেবে দেখা, কর্মীদের আত্মিক ও নৈতিক কল্যাণের বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা এবং গ্রাহকের সঙ্গে সব ধরনের লেনদেনে সততা বজায় রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়নে শুধু উদ্যোক্তাদের নয়, আলেম, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও তরুণদেরও সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। ব্যবসা, সময় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আল্লাহকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালনা করা গেলে তা যেমন পার্থিব সফলতা বয়ে আনতে পারে, তেমনি পরকালেও কল্যাণের কারণ হতে পারে।
সিএ/এমআর


