ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষায় বলা হয়েছে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন বা অতিরঞ্জন থেকে বিরত থাকাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আবেগ, খাদ্যাভ্যাস, ব্যয়, বিনোদন কিংবা ইবাদত—সব ক্ষেত্রেই পরিমিতি বজায় রাখার নির্দেশনা রয়েছে ইসলামি শিক্ষায়।
ইসলামি পরিভাষায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা সীমা ছাড়িয়ে কোনো কিছু করাকে ‘ইসরাফ’ বলা হয়। কোরআনে অপচয়কারী ও সীমালঙ্ঘনকারীদের সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে অনেকেই অজান্তেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসরাফে জড়িয়ে পড়েন, যা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্যই নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে।
আবেগ প্রকাশ মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলেও তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সমস্যা তৈরি হয়। অতিরিক্ত রাগ যেমন ক্ষতির কারণ হতে পারে, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অবস্থান না নিয়ে সব সময় নীরব থাকাও সমানভাবে অনুচিত। কোরআনে বলা হয়েছে, মুমিনরা সৎ কাজের নির্দেশ দেন এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকতে মানুষকে আহ্বান করেন। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)
একইভাবে অতিরিক্ত ভালোবাসা, আসক্তি, শোক, ভয় বা উদ্বেগও মানুষের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই ইসলাম অনুভূতিকে অস্বীকার না করে নিয়ন্ত্রিত ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখার শিক্ষা দেয়।
খাদ্যাভ্যাসেও পরিমিতি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। শুধু খাবার নষ্ট করাই নয়, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত রান্না করা বা অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করাও ইসরাফের অন্তর্ভুক্ত। পারিবারিক অনুষ্ঠান, দাওয়াত কিংবা রমজানের সাহরি-ইফতারে অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবারের আয়োজন ও গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়, যা আত্মসংযমের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
নবীজি (সা.) পরিমিত খাওয়ার শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য আর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য খালি রাখা উচিত এবং মানুষ তার পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট আর কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)
বর্তমান সময়ে সময়ের অপচয়ও বড় একটি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় ব্যয় করা কিংবা উদ্দেশ্যহীন আড্ডায় সময় নষ্ট করা মানুষের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। ইসলাম বিশ্রাম ও বৈধ বিনোদনের অনুমতি দিলেও তা যেন দায়িত্ব, পরিবার ও ইবাদতের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় পড়ে আছে—সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪১২)
কেনাকাটার ক্ষেত্রেও ইসলাম প্রয়োজন ও সামর্থ্যের মধ্যে থাকার নির্দেশ দেয়। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, ছাড়ের লোভে পণ্য মজুত করা কিংবা সামাজিক মর্যাদা দেখাতে অতিরিক্ত ব্যয় করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭), আর মুমিনদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে, ‘যখন তারা ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না; বরং এই দুয়ের মধ্যবর্তী পথ ধরে।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)
বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান বা অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রেও সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় কিংবা সামাজিক চাপের কারণে ঋণগ্রস্ত হওয়াকে ইসলাম সমর্থন করে না। আন্তরিকতা ও পরিমিতিই সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত বলে ধর্মীয় শিক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ইবাদতের ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে। পরিবার, সমাজ ও নিজের অন্যান্য দায়িত্ব উপেক্ষা করে অতিরিক্ত ইবাদতে নিমগ্ন হওয়াকে ইসলাম উৎসাহিত করে না। বরং জীবনের প্রতিটি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাকেই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘ইসলাম ধর্ম অত্যন্ত সহজ। যে এতে কঠোরতা করতে যাবে, ধর্মই তার ওপর প্রবল হয়ে যাবে। তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৯)
এ বিষয়ে একটা সুন্দর হাদিস আছে। তিন সাহাবি একবার নবীজির স্ত্রীদের কাছে এসে তাঁর ইবাদতের কথা জানতে চাইলেন এবং নিজেরা সিদ্ধান্ত নিলেন—সারা রাত নামাজ পড়বেন, রোজা রাখবেন প্রতিদিন, বিয়েই করবেন না।
এ কথা শুনে নবীজি (সা.) বললেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি, আর তাঁকে বেশি জানি। আমি প্রতিদিন রোজা রাখি না, সারা রাত নামাজ পড়ি না, স্ত্রীসঙ্গও গ্রহণ করি। যে আমার পথ অনুসরণ করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৩)
ইসলামি শিক্ষায় বলা হয়েছে, মানুষ যদি নিজের জীবনকে নিয়মিত মূল্যায়ন করে এবং কোথায় সীমা অতিক্রম করছে তা উপলব্ধি করতে পারে, তবে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনে ফিরে আসা সম্ভব। সন্তান লালন-পালন, ভালোবাসা প্রকাশ কিংবা দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই মধ্যপন্থা অনুসরণ মানসিক প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক।
কোরআনে মুমিনদের জন্য একটি দোয়ার উল্লেখ রয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের পাপ ক্ষমা করো, আমাদের কাজে যে সীমালঙ্ঘন হয়েছে তা ক্ষমা করো, আমাদের দৃঢ়পদ রাখো, আর কাফেরদের মোকাবিলায় আমাদের সাহায্য করো।’ (সুরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৪৭)
সিএ/এমআর


