কানাডার কুইবেক প্রদেশের ছোট্ট শহর টেরাস-ভদ্রুইল গাছকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। শহর কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গাছকে শুধু পরিবেশের একটি অংশ হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব অধিকারসম্পন্ন একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, কুইবেক এবং পুরো কানাডায় এ ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম।
গত ৯ জুন টেরাস-ভদ্রুইল সিটি কাউন্সিল সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। এতে বলা হয়েছে, গাছেরও বেঁচে থাকার, স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার, অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত থাকার এবং নতুনভাবে জন্ম নেওয়ার অধিকার রয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শহরটি পরিবেশ সংরক্ষণে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশেও প্রকৃতির অধিকার নিয়ে নজির রয়েছে। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট তুরাগ নদীকে ব্যক্তি-আইনি সত্তা বা জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করে রায় দেন। একই সঙ্গে দেশের সব নদ-নদীকেও একই ধরনের মর্যাদা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারার সঙ্গে মিল রেখেই এবার গাছকে অধিকারসম্পন্ন সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিল কানাডার এই শহর।
শহরের মেয়র মিশেল বুরদো বলেন, ‘কুইবেকের চলচ্চিত্র নির্মাতা আন্দ্রে দেশরোশের একটি তথ্যচিত্র স্থানীয় মানুষকে এই উদ্যোগ নিতে অনুপ্রাণিত করেছে।’
‘দে জার্ব এ দে জার’ নামের একটি তথ্যচিত্র দেখার পর অনেক বাসিন্দা নতুনভাবে উপলব্ধি করেন যে গাছও জীবন্ত। তারা শ্বাস নেয়, বেড়ে ওঠে এবং শিকড়ের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগও করতে পারে। এই উপলব্ধি থেকেই গাছের অধিকার রক্ষার বিষয়ে জনমত তৈরি হয়।
বুরদোর ভাষায়, ‘একটি গাছ অনেকটা মানুষের মতো। এটি শ্বাস নেয়, বেঁচে থাকে, পানি গ্রহণ করে। আবার নানা ধরনের বিপদ থেকেও আমাদের রক্ষা করে।’
আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল অবজারভেটরি অব নেচার রাইটস জানিয়েছে, প্রায় দুই হাজার মানুষের এই শহরটি ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব দ্য রাইটস অব দ্য ট্রি বা গাছের অধিকারসংক্রান্ত সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী কানাডার প্রথম পৌরসভা। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে।
ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, গাছ পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ও মানবসভ্যতার টিকে থাকার অন্যতম ভিত্তি। তাই মানুষের উচিত গাছের সঙ্গে সহাবস্থান, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে শহরের গাছ সংরক্ষণবিষয়ক বিদ্যমান নীতিমালা ও বিধি নতুনভাবে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন মেয়র। কোনো গাছ কাটতে হলে তার বিকল্প হিসেবে নতুন গাছ লাগানো বা সমপর্যায়ের পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি শহরের সবুজায়ন বাড়াতে বাসিন্দাদের বিনা মূল্যে গাছের চারা বিতরণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বুরদোর মতে, ‘গাছ আসলে একধরনের সবুজ অবকাঠামো। গাছ শহরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে, বাতাস পরিষ্কার রাখে, পানিসম্পদ রক্ষা করে এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
বনাঞ্চলঘেরা টেরাস-ভদ্রুইলের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরেই প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনে অভ্যস্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহরটি একাধিকবার বন্যার মুখোমুখি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই সিদ্ধান্তকে ভবিষ্যৎ পরিবেশ সুরক্ষার অংশ হিসেবে দেখছে স্থানীয় প্রশাসন।
প্রকৃতির অধিকার প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক আন্দোলনের অংশ হিসেবেও এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইন্টারন্যাশনাল অবজারভেটরি অব নেচার রাইটসের সভাপতি ইয়েনি ভেগা কার্দেনাস বলেন, ‘গাছের অধিকার নিয়ে এই উদ্যোগটি সেই বৈশ্বিক আন্দোলনের অংশ, যার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক অঞ্চলকে আইনি মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বুঝতে হবে, গাছেরও মর্যাদা আছে। তারা তাদের চারপাশের পরিবেশ অনুভব করতে পারে। মানুষের মতো আবেগ না থাকলেও তারা নানা ধরনের সংকেত গ্রহণ করে এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগও করে।’
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ইকোজাস্টিসের আইনজীবী কারিন পেলতিয়ে এই সিদ্ধান্তকে প্রকৃতির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের জন্য আশাব্যঞ্জক বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, করপোরেশনগুলোর আইনি অধিকার আছে, অথচ তারা তো জীবন্ত নয়। তাহলে জীবন্ত সত্তাগুলো একই ধরনের আইনি স্বীকৃতি পাবে না কেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘আদালতে দাঁড়ানোর অধিকার বা আইনি অবস্থানের কথা যদি বলতেই হয়, তবে একটি গাছই তো সারা জীবন মাটি আঁকড়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে! তাই এই অধিকারের দাবিদার গাছ অবশ্যই হতে পারে।’
সিএ/এমআর


