পৃথিবীতে এমন কিছু গাছ আছে, যেগুলো শুধু তাদের আকৃতি নয়, অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের কারণেও মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ইয়েমেনের সোকোত্রা দ্বীপের ড্রাগন ব্লাড ট্রি তেমনই এক বিস্ময়কর উদ্ভিদ। গাছটির কাণ্ডে আঘাত করলে সেখান থেকে বের হয় গাঢ় লাল রঙের এক ধরনের তরল, যা দেখতে অনেকটা রক্তের মতো। এই কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গাছটি নানা কিংবদন্তি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয় হয়ে রয়েছে।
ড্রাগন ব্লাড ট্রির বৈজ্ঞানিক নাম Dracaena cinnabari। এর আকৃতিও বেশ ব্যতিক্রমী। মোটা কাণ্ডের ওপর ছাতার মতো বিস্তৃত সবুজ শাখা-প্রশাখা গাছটিকে অন্যসব উদ্ভিদ থেকে আলাদা করেছে। দূর থেকে দেখলে অনেকের কাছে এটি বিশালাকৃতির কোনো সবুজ ছাতার মতো মনে হয়।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে গাছটির লাল রঙের নিঃসরণ। অনেকেই একে গাছের রক্ত বলে মনে করলেও বাস্তবে এটি রক্ত নয়। এটি এক ধরনের রেজিন বা উদ্ভিজ্জ নির্যাস, যা গাছের আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পোকামাকড়ের আক্রমণ, প্রাণীর আঁচড় কিংবা অন্য কোনো কারণে গাছের কাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলে অভ্যন্তরীণ কোষগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর বিশেষ রেজিন উৎপাদনকারী অংশ থেকে ঘন তরল বেরিয়ে এসে ক্ষতস্থান ঢেকে দেয়। এর ফলে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান গাছের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।
এই রেজিনের লাল রঙের জন্য দায়ী দুটি রাসায়নিক যৌগ—ড্র্যাকোরুবিন এবং ড্র্যাকোরোডিন। উভয়ই ফ্ল্যাভোনয়েড শ্রেণির উপাদান। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব যৌগের আণবিক গঠন এমন যে তারা দৃশ্যমান আলোর নির্দিষ্ট অংশ প্রতিফলিত করে গাঢ় লাল রঙ সৃষ্টি করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরো রেজিনে এই রঞ্জক পদার্থের পরিমাণ খুবই সামান্য। তারপরও এদের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে রঙটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ ছাড়া রেজিনে সিনাবারোন, ট্রাইফ্ল্যাভোনয়েড, চ্যালকোন, স্টেরল এবং টার্পেনয়েডসহ আরও নানা জৈব যৌগ থাকে, যা গাছের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে।
রেজিন বের হওয়ার পর এর মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাতাসের সংস্পর্শে এসে তরলটি ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায় এবং ক্ষতস্থানের ওপর একটি সুরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে পলিমারাইজেশন নামে অভিহিত করেন।
এই শক্ত আবরণ শুধু ক্ষতস্থান রক্ষা করে না, বরং আর্দ্রতা প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। ফলে গাছটি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ পায়।
ড্রাগন ব্লাড ট্রি উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছেও একটি রহস্যময় উদ্ভিদ। সাধারণত একবীজপত্রী উদ্ভিদের কাণ্ড বয়স বাড়ার সঙ্গে খুব বেশি মোটা হয় না। কিন্তু এই গাছের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়। এর কাণ্ডে সেকেন্ডারি গ্রোথ হয় এবং এমনকি গ্রোথ রিংও তৈরি হতে পারে, যা সাধারণত দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদে দেখা যায়।
বিজ্ঞানীরা এখনো অনুসন্ধান করছেন, কীভাবে এই উদ্ভিদ বিবর্তনের পথে এমন বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে।
ড্রাগন ব্লাড ট্রির রেজিন বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সভ্যতায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রে এটি ত্বকের ক্ষত, দাঁতের সমস্যা, চোখের রোগ এবং হজমজনিত নানা সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো।
আধুনিক গবেষণায়ও এর কিছু সম্ভাবনাময় বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। গবেষকেরা রেজিনে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টিভাইরাল, প্রদাহবিরোধী, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এবং অ্যান্টিটিউমার কার্যকারিতার প্রমাণ পেয়েছেন।
চিকিৎসার পাশাপাশি শিল্প ও কারুশিল্পেও এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক। ইউরোপের মধ্যযুগীয় শিল্পীরা রং তৈরিতে এটি ব্যবহার করতেন। বিখ্যাত স্ট্র্যাডিভেরিয়াস বেহালার বিশেষ ফিনিশিংয়েও ড্রাগন ব্লাড রেজিন ব্যবহারের ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে।
তবে বর্তমানে এই বিরল গাছটির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সোকোত্রা দ্বীপে অতিরিক্ত ছাগল চরানোর কারণে নতুন চারা বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও গাছটির প্রাকৃতিক প্রজননব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গবেষকদের সতর্কবার্তা, সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার না করা হলে ভবিষ্যতে পৃথিবীর অন্যতম ব্যতিক্রমী এই উদ্ভিদ আরও সংকটের মুখে পড়তে পারে। লক্ষ বছরের বিবর্তনে গড়ে ওঠা এই প্রাকৃতিক বিস্ময় রক্ষা করতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
সিএ/এমআর


