চট্টগ্রামে গত কয়েকদিন ধরে শিশুদের মধ্যে জ্বরের প্রকোপ বাড়তে থাকায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চার বছরের শিশু লুবাবা রহমান টানা তিন দিন ধরে জ্বরে ভুগছে। সকালে কিছুটা কমলেও বিকেলের দিকে তার শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে এবং একপর্যায়ে মধ্যরাতে তা ১০৪ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। এ ধরনের পরিস্থিতি এখন নগরীর অনেক পরিবারের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের বেশিরভাগের বয়স চার থেকে আট বছরের মধ্যে এবং অনেক ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক শিশু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি জ্বরে আক্রান্ত। একই সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব থাকায় শিশুদের জ্বর নিয়ে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, বুধবার (১ এপ্রিল) পর্যন্ত হাম সন্দেহে ৭৬ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে আট শিশুর শরীরে হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে এবং ইতোমধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। হাম শনাক্তের জন্য ১১১ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের ‘মিজেলস ব্লক’-এ এখন পর্যন্ত ৪৮ শিশু ভর্তি রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৫ জন জ্বরে আক্রান্ত। বুধবার (১ এপ্রিল) একদিনেই হামের উপসর্গ নিয়ে ১৮ শিশু ভর্তি হয়েছে, আগের দিন ভর্তি হয়েছিল ২৬ জন। এদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় পিআইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও জ্বরের রোগীর চাপ বেড়েছে। মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পার্কভিউ, ম্যাক্স, সিএসসিআর, মেডিকেল সেন্টার, মেট্রোপলিটন, ন্যাশনাল, ডেল্টা, পলি, শেভরন ও এপিকসহ প্রায় সব হাসপাতালেই জ্বরের রোগী বাড়ছে।
জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশু আনাফ ইসলামের মা পপি বেগম বলেন, মধ্যরাতে দেখি জ্বরে পুরো শরীর পুড়ে যাচ্ছে। সকালে জ্বরের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় কাশি, শ্বাসকষ্ট। দুদিন ধরে তার শরীরের কয়েকটি অংশে লালচে ফুসকুড়ি দেখা গেছে। হামের বেশ কিছু লক্ষণ থাকায় কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
শিশু নাফিজার মা আইরিন রহমান বলেন, চার দিন ধরে জ্বরে ভুগছে সে। দিনে জ্বরের মাত্রা কিছুটা কম থাকলেও রাতে বেড়ে যায়। দুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে শ্বাসকষ্ট। মুখে কিছু খেতেও চাইছে না সে।
চট্টগ্রাম নগরের মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা মো. সাকিব বলেন, রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে আমার পাঁচ বছরের মেয়ে তাবিবা। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দেখি তার শরীরে জ্বর। এর দুদিনের মাথায় দুই বছরের ছোট মেয়েটাও জ্বরে আক্রান্ত হয়।
চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বলেন, জ্বরের পর অনেক শিশুর মধ্যে কাশি, শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এ কারণে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অনেক অভিভাবক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাওয়াচ্ছেন, যা শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শিশুদের বাইরে না নেওয়া এবং কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করার ওপরও গুরুত্ব দেন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা ঢাকার পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হচ্ছে। তিনি জানান, এ পরিস্থিতিতে শিশুদের বিষয়ে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে এবং উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সিএ/এএ


