Sunday, September 6, 2026
26 C
Dhaka

ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগের দাবি রুবিওর

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চললেও তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটন সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা হবে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব মন্তব্য করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সব সময় কূটনৈতিক সমাধানকে গুরুত্ব দেন, তবে প্রয়োজন হলে সামরিক চাপও বজায় রাখা হবে।

রুবিও বলেন, ইরানকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করতে হবে এবং এমন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন বন্ধ করতে হবে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ইরান সরকার কখনো পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘তারা যে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করছে, তার একমাত্র লক্ষ্য হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনকে আক্রমণ করা।’

যদিও তিনি আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেছেন, সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেননি। অথচ আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা রয়েছে যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

রুবিও বলেন, ইরান চাইলে বেসামরিক কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করতে পারে। তবে তা এমনভাবে হতে পারবে না, যাতে দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ তৈরি হয়।

এদিকে রুবিওর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান কবে এই অঞ্চলের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল। তিনি বলেন, ‘গত তিন শতাব্দীর মধ্যে ইরান কবে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আক্রমণ করেছে? এখন কেন তারা এমন করছে? কারণ, একটি অসম যুদ্ধে তারা দুর্বল প্রতিপক্ষ। তাই নিজেকে রক্ষা করতে তারা এ যুদ্ধের বিস্তার ঘটাচ্ছে।’

হরমুজ প্রণালি নিয়ে মার্কিন অবস্থানও পরিষ্কার করেছেন রুবিও। তিনি বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের দাবি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না।

রুবিও বলেন, ‘কেবল আমরা নয়, বিশ্বের কেউ–ই হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌমত্বের দাবি মেনে নেবে না। এটি একটি অদ্ভুত নজির স্থাপন করবে…বিভিন্ন দেশ এখন আন্তর্জাতিক জলপথ দখল করে তা নিজেদের বলে দাবি করবে। হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে…এটি যেকোনো মূল্যে খোলা থাকবে।’

তিনি জানান, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়নি। বেশির ভাগ আলোচনা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলছে এবং কিছু সীমিত সরাসরি যোগাযোগও রয়েছে।

রুবিও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের ভেতরের কিছু পক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং কিছু সরাসরি আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সব সময় কূটনীতি পছন্দ করেন, সব সময় একটি সমাধান চান।’

যদিও আলোচনার কথা বলা হচ্ছে, একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর ভাষায় ইরানের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, দ্রুত যুদ্ধবিরতি না হলে তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করার পদক্ষেপ নিতে পারেন।

সাক্ষাৎকারে রুবিও আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান দ্রুত এগোচ্ছে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রধান সামরিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ‘লক্ষ্যগুলো হলো তাদের বিমানবাহিনী ধ্বংস করা, যা ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে। তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করা, যা অনেকটাই অর্জিত হয়েছে।’

রুবিও আরও বলেন, ‘তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যন্ত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো গেছে…এবং আমরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনকারী কারখানাগুলোও ধ্বংস করতে যাচ্ছি। আমরা ঠিক সময়ে বা সময়ের আগেই এগোচ্ছি। আমরা কয়েক মাসের মধ্যে নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এগুলো অর্জন করব। এটি কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার। আমি ঠিক কত সপ্তাহ হবে বলব না, তবে এটি কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার, মাসের নয়।’

ইরানের নেতৃত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরেন রুবিও। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রুবিও বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না, তিনি ক্ষমতায় আছেন কি না। এটুকু জানি, তারা দাবি করে, তিনি ক্ষমতায় আছেন। কেউ তাঁকে দেখেনি। কেউ তাঁর কোনো বক্তব্য শোনেনি। এখন পরিস্থিতি খুবই অস্পষ্ট। ইরানের ভেতরে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।’

ইরানে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়েও মন্তব্য করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ইঙ্গিত দেন, এমন পরিবর্তন ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র তা স্বাগত জানাবে, যদিও এটিকে সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।

রুবিও বলেন, ‘আমরা সব সময় এমন একটি পরিস্থিতিকে স্বাগত জানাব, যেখানে ইরানের লোকজন এমন নেতৃত্বে থাকবে, যাঁরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। ইরানি জনগণ আরও ভালো নেতৃত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একে সহজতর করতে যদি আমাদের কিছু করার সুযোগ থাকে, আমরা তা করতে ইচ্ছুক হব, অবশ্যই হব।’

তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। কাতারে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মাসগ্রাভ বলেন, ‘মূলত সরকার উৎখাত করাই তাদের লক্ষ্য ছিল; নিজেদের সে অবস্থান থেকে তারা ধীরে ধীরে সরে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার কথা বলছেন, যারা ভবিষ্যতে নতুন সরকারের অংশ হতে পারে। এতে পুরো পরিস্থিতি কিছুটা বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠেছে।

ন্যাটো মিত্রদের ভূমিকাও সমালোচনা করেন রুবিও। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ন্যাটো দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে না।

রুবিও বলেন, ‘আমাদের স্পেনের মতো দেশ আছে, যারা ন্যাটোর সদস্য এবং যাদের আমরা রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তারা আমাদের তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিচ্ছে না এবং এ নিয়ে গর্ব করছে, আমাদের তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে না।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি ন্যাটো কেবল ইউরোপকে রক্ষা করার জন্য হয়, কিন্তু প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে জোটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সিএ/এমই

spot_img

আরও পড়ুন

জিকিরে বাড়ে মানসিক দৃঢ়তা, প্রশান্ত হয় হৃদয়

মানুষকে আল্লাহ তাআলা স্বভাবগতভাবেই দুর্বল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। শারীরিক...

চট্টগ্রামে বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি, পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখের বেশি মানুষ

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন...

২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে শরীরে কী ঘটে? জানালেন বিশেষজ্ঞরা

টানা ২৪ ঘণ্টা উপবাস বা না খেয়ে থাকা সাম্প্রতিক...

মানসিক চাপ কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বর্তমান ব্যস্ত জীবনযাত্রায় মানসিক চাপ অনেকের কাছেই নিত্যদিনের সঙ্গী।...

সিলেটে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করল উবার

অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবাকে আরও বিস্তৃত করতে সিলেটে পূর্ণাঙ্গ...

মহাকাশে আধিপত্যের নতুন প্রতিযোগিতা, মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

বিশ্বরাজনীতি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের পর এবার মহাকাশকে কেন্দ্র করে...

বাড়িতেই তৈরি করুন সুস্বাদু চিংড়ি সমুচা

বিকেলের নাস্তা, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় সমুচা জনপ্রিয়...

পাকা আম দিয়ে সহজেই তৈরি করুন সুস্বাদু পোয়া পিঠা

গ্রীষ্মের মৌসুমে পাকা আম দিয়ে নানা ধরনের মিষ্টান্ন ও...

৮১০০ এমএএইচ ব্যাটারির ভিভো ওয়াই৫০০ আসছে, এক চার্জে ৩৫ ঘণ্টা ভিডিও দেখার দাবি

বাংলাদেশের বাজারে নতুন ব্যাটারিকেন্দ্রিক স্মার্টফোন ‘ভিভো ওয়াই৫০০’ আনার ঘোষণা...

প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি, যেসব লক্ষণ ও করণীয় জানা জরুরি

তীব্র গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ...

র‍্যামের দাম কমেছে, বেড়েছে পোর্টেবল হার্ডডিস্কের মূল্য

চলতি সপ্তাহে ঢাকার কম্পিউটার বাজারে র‍্যামের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন...

অটোইমিউন রোগের যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়

বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ বিভিন্ন ধরনের অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হলেও...

বিত্তবান হয়েও কেন মানুষ অসুখী? অল্পে তুষ্টির শিক্ষা নিয়ে যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

শৈশবের একটি স্মৃতি তুলে ধরে বর্তমান সমাজে বৈষয়িকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা...
spot_img

আরও পড়ুন

জিকিরে বাড়ে মানসিক দৃঢ়তা, প্রশান্ত হয় হৃদয়

মানুষকে আল্লাহ তাআলা স্বভাবগতভাবেই দুর্বল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। শারীরিক দুর্বলতার পাশাপাশি মানসিক দুর্বলতাও মানুষের জীবনের একটি বাস্তবতা। দুঃখ, উদ্বেগ, সংকট কিংবা অনিশ্চয়তার মুহূর্তে মানুষ...

চট্টগ্রামে বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি, পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখের বেশি মানুষ

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ...

২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে শরীরে কী ঘটে? জানালেন বিশেষজ্ঞরা

টানা ২৪ ঘণ্টা উপবাস বা না খেয়ে থাকা সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে বেশ আলোচিত একটি অভ্যাস। অনেকেই মনে করেন, নির্দিষ্ট সময় খাবার থেকে...

মানসিক চাপ কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বর্তমান ব্যস্ত জীবনযাত্রায় মানসিক চাপ অনেকের কাছেই নিত্যদিনের সঙ্গী। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা ব্যক্তিগত নানা সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে...
spot_img