ঠাকুরগাঁও জেলায় জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় ‘নো ফুয়েল কার্ড, নো পেট্রল-অকটেন’ নীতি চালু করতে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন। নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় আগামী শনিবার (৫ এপ্রিল) থেকে মোটরসাইকেলচালকদের জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে হলে ফুয়েল কার্ড দেখাতে হবে। এ কারণে কার্ড সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে ভিড় করছেন মোটরসাইকেল মালিক ও চালকেরা।
সোমবার (৩১ মার্চ) সকাল ১০টা থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, পৌরসভা এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একযোগে ফুয়েল কার্ড বিতরণ শুরু হয়। দুপুরের দিকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, ফুয়েল কার্ড নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেলচালকদের দীর্ঘ সারি। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ধীরে ধীরে সামনে এগোচ্ছেন।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে মোটরসাইকেলচালকদের জন্য সাতটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ফুয়েল কার্ড চালু করা হয়েছে। কার্ড পেতে মোটরসাইকেলের মালিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, মোটরসাইকেলের নিবন্ধনপত্র এবং চালকের লাইসেন্স দেখিয়ে নিজ নিজ স্থায়ী ঠিকানার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, থানা বা পৌরসভা থেকে কার্ড সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। আর যাঁরা কর্মসূত্রে জেলা শহরে অবস্থান করছেন, তাঁরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ফুয়েল কার্ড নিতে পারবেন।
ঘোষণা অনুযায়ী, শুক্রবার (৪ এপ্রিল) পর্যন্ত মোটরসাইকেলচালকেরা ফুয়েল কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন। এরপর শনিবার (৫ এপ্রিল) থেকে ফুয়েল কার্ড ছাড়া কোনো চালক পেট্রলপাম্প থেকে জ্বালানি তেল নিতে পারবেন না।
জগন্নাথপুর এলাকার বাসিন্দা এনামুল হক একটি হিমাগারে চাকরি করেন। কাজের প্রয়োজনে তাঁকে বিভিন্ন গ্রামে যেতে হয়। দুপুরের দিকে পৌরসভা কার্যালয়ের লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘দেড় ঘণ্টা হয়ে গেল লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এ সময়টুকুতে কেবল ১০ ফুট এগোতে পেরেছি। কখন যে আমার পালা আসবে, বলতে পারছি না।’
ব্যবসায়ী মকছেদুল হকও সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সকাল সাড়ে নয়টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে। তিন ঘণ্টায় কয়েক পা সামনে যেতে পেরেছি। কার্ড দেওয়ার কাজ খুব ধীরে চলছে।’ পরে বেলা একটার দিকে হাতে ফুয়েল কার্ড নিয়ে তিনি ফিরে যান। তাঁর কার্ডে উল্লেখ আছে, একজন গ্রাহক তিন দিনের জন্য ৫ লিটার, সাত দিনের জন্য ১০ লিটার এবং ১২ দিনের জন্য ১৫ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল নিতে পারবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ এই পরিমাণ ও মেয়াদ পরিবর্তন করতে পারবে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মো. আলী জানান, তিনি চার ঘণ্টা ধরে লাইনে অপেক্ষা করছেন। তাঁর মতে, বুথের সংখ্যা বাড়ানো হলে দ্রুত কার্ড বিতরণ করা সম্ভব হতো। তিনি বলেন, ‘আমার সামনে এখনো আরও জনাবিশেক মানুষ আছে। বুথের সংখ্যা বাড়ালে দ্রুত কার্ড বিতরণ করা যেত।’
ফুয়েল কার্ড সংগ্রহ করতে এসে ভোগান্তিতে পড়েছেন আবদুর রাজ্জাকও। তিনি রংপুরের বাসিন্দা হলেও কর্মসূত্রে ঠাকুরগাঁওয়ে থাকেন। তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর তিনি জানতে পারেন, অন্য জেলার বাসিন্দাদের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে কার্ড নিতে হবে। এতে হতাশ হয়ে তিনি বলেন, ‘কষ্টটাই জাই গেল।’
পৌরসভার কর নির্ধারক আবদুর রশিদ জানান, সকাল ১০টা থেকে কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে এবং বেলা দেড়টা পর্যন্ত ৫০টি কার্ড দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এদিকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভায় ফুয়েল কার্ড বিতরণের তদারকি কর্মকর্তা সদর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ৫০০ কার্ড পেয়েছি। সব কাগজপত্র যাচাই করে ফুয়েল কার্ড বিতরণ করতে একটু সময় লাগছে। পরবর্তী কষ্ট লাঘবে এই কষ্টটা মেনে নিতে হবে। বুথ বাড়ানোর প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’
দুপুর দেড়টার দিকে সদর উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ফুয়েল কার্ডপ্রত্যাশীদের লাইন কার্যালয় চত্বর ছাড়িয়ে সোনালী ব্যাংক পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেখানে পুরাতন ঠাকুরগাঁওয়ের ব্যবসায়ী মাজেদুল হক বলেন, ‘এক পা আগাতে অনেক সময় লাগছে। শেষ পর্যন্ত কার্ড পাব কি না, জানি না। না পেলে কষ্ট করে আরেক দিন আসতে হবে।’
জগন্নাথপুর এলাকার বাসিন্দা দুর্লভ রায় একটি কোম্পানির বিপণন বিভাগে কাজ করেন। জ্বালানি তেলের সংকটে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে পারছেন না তিনি। সাড়ে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘রাত হলেও ফুয়েল কার্ড নিয়েই বাড়ি ফিরব। ফুয়েল কার্ড মোর লাগিবেই।’
জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, ফুয়েল কার্ড বিতরণ শেষ হলে বোঝা যাবে কতজন চালক এর আওতায় এসেছেন। তিনি জানান, শনিবার (৫ এপ্রিল) থেকে ফুয়েল কার্ড ছাড়া কোনো মোটরসাইকেলচালক ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারবেন না। পাশাপাশি জেলায় সব নিবন্ধনবিহীন ও অবৈধ যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এসব যান চলাচল বন্ধ করা গেলে বৈধ যানবাহনের চালকেরা সহজে জ্বালানি তেল পাবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সিএ/এমই


