একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ত্যাগের কথা স্মরণ রেখে নতুন প্রজন্মকে দেশ গঠনে এগিয়ে আসতে হবে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা জরুরি।
রোববার (৭ ডিসেম্বর) দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড-২০২৬’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা এসব কথা বলেন। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মূল্যবোধ তুলে ধরতে প্রথম আলো বন্ধুসভার উদ্যোগে মার্চ মাসজুড়ে দেশব্যাপী এ আয়োজন করা হয়। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে অনুষ্ঠিত এ অলিম্পিয়াডে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।
রাজশাহীতে বিকেলে শিক্ষা বোর্ড মডেল সরকারি স্কুল ও কলেজের মিলনায়তনে রাজশাহী বন্ধুসভার উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ২ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির। তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের তাৎপর্য তুলে ধরেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সবাই বলে থাকেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়তে হবে। কিন্তু চেতনাটা কী, সেটি ব্যাখ্যা করে বলেন না। এই চেতনা হচ্ছে সবাই মিলে ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে একসঙ্গে সুখী-সমৃদ্ধ একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা।’ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রথম আলোর রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড মডেল স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ শাহাদাত হোসেন সরকার এবং কবি ও নাট্যকার রাকিব হাসান।
অনুষ্ঠানের শেষে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এতে যৌথভাবে প্রথম স্থান অর্জন করে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী আফসারা ইরা, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী মুমতাহিনা রহমান তমা এবং বঙ্গবন্ধু কলেজের শিক্ষার্থী মেহেরিন নিসা। যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী রোকেয়া খাতুন এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থী রিদওয়ান মোশাররফ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শহরের কলেজপাড়ার আইডিয়াল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুপুরে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম আলো বন্ধুসভার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সভাপতি শাহজাহান মিয়ার সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলেয়া মাহবুবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শাহাদৎ হোসেন।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেক বীর প্রতীক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করেন। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। বয়স যখন ১২ বছর এক মাস, তখন বাবা-মাকে কিছু না বলে কিছু সেদ্ধ ধান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতে যাই। এতই ছোট ছিলাম, কেউ প্রশিক্ষণে নিতে রাজি ছিল না। আমার সাহস ও যুদ্ধ করার আগ্রহ দেখে আমাকে নির্বাচন করা হয়। পরে কসবার সীমান্তবর্তী গঙ্গাসাগর, মনিয়ন্দসহ বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেছি। প্রত্যেক যুদ্ধে জয়ী হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুধু মুক্তিযুদ্ধ না। এই দেশ এমনি এমনিই স্বাধীন হয়নি। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, ৩০ লাখ শহীদের বুকের তাজা রক্ত এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা। কিন্তু যখন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কেউ বিরূপ ভাব প্রকাশ করেন, তখন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধকে কোনোভাবেই অবহেলা ও অসম্মান করা যাবে না।’
নীলফামারীতে শহরের ছমির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজে নীলফামারী বন্ধুসভার উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা বঙ্কু বিহারী রায় বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীনতা পেয়েছি। বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। কারণ, আজকের তরুণেরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।’
পরে কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঁচজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। জলঢাকা উপজেলার শিমুলবাড়ি শিডিউল কাস্ট উচ্চবিদ্যালয়ের মো. রিপন ইসলাম প্রথম, নীলফামারী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের মুহিত ইসলাম দ্বিতীয়, নীলফামারী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের জান্নাতি বৃষ্টি তৃতীয়, ছমির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানষী রায় চতুর্থ এবং নওশীন শারমিলি পঞ্চম স্থান অর্জন করে।
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড। এতে বিভিন্ন শ্রেণির ৮০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। কুইজের ফলাফল ঘোষণার আগে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন অতিথিরা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লেখক ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল খালিক।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা চাই, তোমরা মানবিক মানুষ হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়বে। মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা বই পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা কোনো কিছু পাওয়ার আশায় যুদ্ধ করেননি। দেশের জন্যই তাঁরা জীবন বাজি রেখেছিলেন।’
গোপালগঞ্জে বটতলায় আইকন প্লাস কোচিং সেন্টারের হলরুমে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু হোসেন। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার, বাঙালি জাতির মুক্তির দলিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। তোমাদের জন্য একটি স্বাধীন ভূখণ্ড উপহার দেওয়াই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে এবং সেই চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’
সুনামগঞ্জে সকালে বুলচান্দ হাইস্কুল ও কলেজে অনুষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের কুইজ প্রতিযোগিতা। এতে ৬৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বিকেলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সেখানে সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘কিছু পাওয়ার আশায় আমরা যুদ্ধ করিনি। আমাদের লক্ষ্য ছিল কেবল স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে আমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমাদের মনে সংশয় ছিল সেনাবাহিনী কী করবে। কিন্তু পরে যখন কালুরঘাট থেকে জিয়াউর রহমান ঘোষণা পাঠ করলেন, সেটি আমাদের আরও উজ্জীবিত করে।’
পরে বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে বই ও পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।
সিএ/এমই


