রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাস ডুবে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ঘাটের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অরক্ষিত পন্টুন, রেলিংবিহীন ঘাট, ঢালু ও খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক এবং ফেরিতে আগে ওঠার প্রতিযোগিতাসহ নানা অব্যবস্থাপনাকে এ দুর্ঘটনার পেছনের বড় কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
দুর্ঘটনার পর গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রাজবাড়ীর ১২টি পরিবারের ১৮ জন রয়েছেন। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার চারজন, ঝিনাইদহের একজন, গোপালগঞ্জের একজন, দিনাজপুরের একজন এবং ঢাকার আশুলিয়ার একজন রয়েছেন। কোনো পরিবারে মা-ছেলে ও নাতি, কোথাও স্বামী-স্ত্রী, আবার কোথাও মা-মেয়ে বা মা-ছেলের মৃত্যু হয়েছে।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ডুবুরি দল বুধবার মধ্যরাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে বাসের ভেতর থেকে ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে নদী থেকে বাসটি তোলার পর বৃহস্পতিবার বেলা দুইটা পর্যন্ত আরও আটজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে বুধবার বিকেলে দুইজনকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি জানান, নিহতদের পরিবারের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আহতদের তালিকা প্রস্তুত হলে প্রত্যেককে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস বলেন, নিহতদের মধ্যে চারজন ছেলেশিশু, তিনজন মেয়েশিশু, ১১ জন নারী এবং আটজন পুরুষ রয়েছেন।
গত বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে নদী পারাপারের অপেক্ষায় থাকা ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল। যাত্রা শুরুর সময় বাসটিতে মাত্র ছয়জন যাত্রী ছিলেন। পরে পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ৫০ জন যাত্রী ওঠেন।
ফেরিঘাটের পন্টুনগুলো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুনটি বেশ পুরোনো এবং সেখানে কোনো ধরনের নিরাপত্তা রেলিং বা বেষ্টনী নেই। একই অবস্থা রয়েছে ৪ ও ৭ নম্বর ঘাটেও। ফলে যানবাহন ও যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে পন্টুন দিয়ে ফেরিতে ওঠানামা করতে হয়।
মেহেরপুর থেকে ঢাকাগামী জেআর পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সুপারভাইজার শরিফুল ইসলাম বলেন, পন্টুনে কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী বা রেলিং নেই; থাকলে ওই বাসটি নদীতে পড়ে ডুবে যেত না। এত মানুষের প্রাণহানিও হতো না।
ফেরিঘাটের সংযোগ সড়কগুলোও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে মূল সড়ক থেকে পন্টুন পর্যন্ত অ্যাপ্রোচ সড়কগুলো বেশ ঢালু এবং বহু জায়গায় খানাখন্দ রয়েছে। এতে ভারী যানবাহন ফেরিতে ওঠানামার সময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে চালকদের সমস্যায় পড়তে হয়।
খাদ্য উৎপাদনকারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাভার্ড ভ্যানচালক পলাশ শেখ বলেন, ফেরিতে ওঠানামার সড়কগুলো খুবই ঢালু। লোড থাকা অবস্থায় গাড়ি ওঠানামা করতে ব্রেক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্রেক ফেল করলে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে।
ঘাট পরিচালনায়ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী ফেরিতে থাকা সব যানবাহন নামার পর অপেক্ষমাণ যানবাহনগুলো পন্টুনে উঠবে। তবে দুর্ঘটনার সময় হাসনাহেনা নামের ফেরিটি ঘাটে পৌঁছানোর আগেই বাসটি সংযোগ সড়ক থেকে পন্টুনে উঠে যায় এবং পরে নদীতে পড়ে যায়।
সৌহার্দ্য পরিবহনের দৌলতদিয়া ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মনির হোসেন বলেন, অনেক সময় ঘাটের পরিস্থিতি না বুঝেই ঢাকামুখী যানবাহনগুলোকে ফেরিঘাটে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বুধবারও একইভাবে বাসটিকে ৩ নম্বর ঘাটে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে অপেক্ষার সময় ছোট একটি ফেরি এসে পন্টুনে ধাক্কা দিলে ঢালু সড়কে বাসটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি নদীতে পড়ে যায়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তাঁরা দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পন্টুনে নিরাপত্তা রেলিং বসানোসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান বলেন, সাধারণত গাড়িগুলো পন্টুনে আসার আগে থামে এবং ফেরি প্রস্তুত হলে ওঠে। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় দেখা গেছে, ফেরিটি প্রস্তুত হওয়ার আগেই বাসটি পন্টুনে চলে আসে।
তবে বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন দাবি করেন, বাসটির ব্রেক ফেল করায় চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং এ কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
এদিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উছেন মে কমিটির আহ্বায়ক। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকেও ছয় সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুহিদুল ইসলাম। তাদেরও তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর যৌথ দল উদ্ধার অভিযান চালায়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, এখন পর্যন্ত নতুন করে নিখোঁজের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যদি নিখোঁজের খবর পাওয়া যায়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করা হবে। শুক্রবার ( ৫ ডিসেম্বর) সকাল থেকে আবার উদ্ধার অভিযান চালানোর কথা রয়েছে।
সিএ/এমই


