রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সকালেই মায়ের লাশ দাফন করা হয়েছে, আর বিকেলে বাবার মরদেহও দাফনের জন্য আনা হয়। একই দিনে মা–বাবাকে হারিয়ে দুই ভাইয়ের কান্নায় শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো গ্রামে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও থামছিল না তাঁদের কান্না।
বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে বোয়ালিয়া গ্রামের একটি বাড়ির সামনে মানুষের ভিড় জমে যায়। বাড়ির ভেতরে কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত দুই ভাই মৌমিত আলম ও মাহিম আলম বিছানায় শুয়ে ছিলেন। বন্ধু ও স্বজনেরা তাঁদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু মা–বাবাকে হারানোর শোক যেন কোনোভাবেই থামছিল না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মৌমিত ও মাহিমের মা মুক্তা খানম (৩৮) ও বাবা জাহাঙ্গীর আলম বুধবার বিকেলে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবির ঘটনায় মারা যান। বৃহস্পতিবার সকালে মুক্তা খানমের মরদেহ গ্রামে এনে স্থানীয় মসজিদের পাশে দাফন করা হয়। তবে সে সময় জাহাঙ্গীর আলমের মরদেহ পাওয়া যায়নি। পরে দুপুরে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তাঁর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বিকেলে বাড়ির উঠানে খাটিয়ায় জাহাঙ্গীর আলমের মরদেহ রাখা হলে সেখানে স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। পাশে বসে থাকা তাঁর মেজ ভাই সাইদ আহমেদ বলেন, তাঁরা পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে জাহাঙ্গীর সবার ছোট ছিলেন। সবার আগে তাকেই চলে যেতে হলো। এ কথা বলতে বলতেই তিনি আবেগে বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর আলম পেশায় পল্লিচিকিৎসক ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী মুক্তা খানম গৃহিণী। জাহাঙ্গীরের পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ায় চিকিৎসার জন্য স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন তিনি। সেই পথেই ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
বড় ছেলে মৌমিত আলম উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, বুধবার দুপুরে মা–বাবাকে বাসে তুলে দিয়ে আসেন। বিকেলে ফেরিঘাটে পৌঁছে মায়ের ফোন পান তিনি। মা তাঁকে জানায়, একটু পর ফেরিতে উঠবে বাস। তাঁর বাবা সুস্থ আছেন। এর ঠিক ২০ মিনিট পর জানতে পারেন, বাস ডুবেছে। বাসের নাম জানার পর বুকটা ধুকপুক করতে থাকে। ফোন দিতেই মায়ের ফোন বন্ধ পান।
পরে রাতে জানতে পারেন, তাঁর মায়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ভোরে মরদেহ গ্রামে এনে দাফন করা হয়। তবে তখনও বাবার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে দুপুরে প্রশাসনের মাধ্যমে জাহাঙ্গীর আলমের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জাহাঙ্গীরের ছোট ছেলে মাহিম আলম নবম শ্রেণিতে পড়ে। সে নানির বাড়িতে ছিল। মাহিম জানায়, দুর্ঘটনার আগের দিন বাবার সঙ্গে একটু কথা হয়েছিল। শরীরে অ্যালার্জি হওয়ায় বাবার কাছ থেকে একটি ওষুধের নাম জেনেছিল সে। এরপরই দুর্ঘটনার খবর পায়।
বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটার দিকে জাহাঙ্গীর আলমের মরদেহের খাটিয়া কাঁধে তুলে নেন দুই ছেলে ও স্বজনেরা। পরে মরদেহ বাড়ির পাশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজা শেষে বাড়ির সামনে মসজিদ প্রাঙ্গণে স্ত্রী মুক্তা খানমের কবরের পাশেই জাহাঙ্গীর আলমকে দাফন করা হয়।
এর আগে বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাসটিতে প্রায় ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত শিশু ইসরাফিলসহ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সিএ/এমই


