রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর গ্রামের বুলবুলি বেগম একসময় ছিলেন শুধুই গৃহিণী। সংসারের কাজ শেষ করে দিনের বেশির ভাগ সময় কাটত অবসরে। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমই আজ তাকে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছে। এখন বুলবুলি হাঁস পালন করে মাসে ৭৫ হাজার টাকা আয় করছেন।
বুলবুলির বাড়ি উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে হাজীপুর গ্রামে। গ্রামে ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশে ছোটখাটো খামার, সবজি চাষ ও হাঁস পালন। সকালে পুকুর ও আশপাশের জলাশয়ে হাঁসগুলো খাবারের খোঁজে ছড়িয়ে পড়ে। বুলবুলি নিজের খামারে ডিম সংগ্রহ ও পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত থাকেন।
বুলবুলি বেগম জানান, ২০০১ সালে এসএসসি পাশের পর তাঁর বিয়ে হয়। স্বামীর পরিবারের সীমিত আয়ের কারণে নিজের কিছু করার তাগিদ থেকেই ২০১০ সালে তিনি হাঁস পালন শুরু করেন। পানবাজারে বেড়াতে গিয়ে এক গৃহবধূর কাছ থেকে হাঁস পালনের কৌশল শিখেন। স্বামীর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে খামার তৈরি করে ৫০০ হাঁসের বাচ্চা কিনে শুরু করেন। চার মাসের মধ্যে হাঁস ডিম দিতে শুরু করে। এক বছরের মধ্যে ডিম বিক্রি করে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। স্বামীর সাপোর্টে আরও ১ হাজার হাঁসের বাচ্চা ক্রয় করে খামার সম্প্রসারণ করেন।
বর্তমানে বুলবুলির খামারে প্রায় তিন হাজার হাঁস আছে। হাঁসের ডিম ও হাঁস বিক্রি করে মাসে ৭৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। তিনি পরিবারের জন্য দুটি পুকুর খনন করেছেন, যেখানে মাছ চাষের পাশাপাশি কৃষিকাজও করছেন। এছাড়া একটি ছোট দোকানও চালান। আয়ের মাধ্যমে জমি কিনেছেন, বাড়ি পাকা করেছেন এবং দুই শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছেন।
বুলবুলি বলেন, ‘শুরুর দিকে অনেক কষ্ট ছিল। মানুষ হাসাহাসি করত। কিন্তু ধীরে ধীরে হাঁসের সংখ্যা বাড়িয়েছি। এখন নিজের আয় আছে। সন্তানদের ভালোভাবে পড়াতে পারছি। এটাই সবচেয়ে বড় সুখ।’ স্বামী আবদুস সালাম বলেন, ‘বউ যখন হাঁস পালন শুরু করে, ভাবিনি এত বড় হবে। কিন্তু ওর পরিশ্রম আর আগ্রহ দেখে আমি পাশে দাঁড়াই। এখন সংসারের বড় অংশ চলে তাঁর আয়ে। আমি গর্বিত।’
বুলবুলি শুধু নিজের সংসার নয়, গ্রামের অন্যান্য গৃহবধূদেরকেও হাঁস পালনের পরামর্শ দেন। ইকরচালী ইউনিয়নের অনেক গৃহবধূ ও বেকার তরুণও তার নির্দেশনায় হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। বালাবাড়ি গ্রামের সাইফুল ইসলাম ও ছাবিয়া বেগমের মতো বহু মানুষ বুলবুলির দেখানো পথে দারিদ্র্য জয় করেছেন।
ইকরচালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তাজউদ্দিন বলেন, বুলবুলি শিক্ষিত ও পরিশ্রমী। তাঁর হাত ধরে ইউনিয়নের অনেকেই দারিদ্র্যের বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়েছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস থাকলে সীমিত সুযোগ দিয়েও সফলতা অর্জন করা যায়। হাজীপাড়ার বুলবুলি বেগম তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি শুধু একজন গৃহিণী নন, একজন সফল উদ্যোক্তা এবং এলাকার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা।’
সিএ/এমই


