ঠাকুরগাঁও শহরের সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে রোববার (৭ ডিসেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভেসে আসে ছন্দময় উচ্চারণ—‘এক-এ তিন, দুই-এ দুই, তিন-এ এক, চার-এ চার, পাঁচ-এ তিন, ছয়-এ …’। পথচারীদের কেউ কেউ থমকে দাঁড়িয়ে লোহার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেন। ভেতরে দেখা যায়, একদল চাকরিপ্রত্যাশী পরীক্ষার পর বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে নিচ্ছেন। তাঁদের এই সমবেত প্রস্তুতির নাম ‘স্টাডি গ্রুপ’।
মাঠের ঈদগাহ মিনারের পাশে প্রায় ৬০ জন তরুণ-তরুণীকে দেখা যায়—কারও হাতে প্রশ্নপত্র, কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। মাঝখানে একজন সঠিক উত্তর বলে দিচ্ছেন, বাকিরা নিজেদের উত্তরপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন। সপ্তাহে তিন দিন—রোববার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার—এভাবে মূল্যায়ন পরীক্ষা হয়। বাকি দিনগুলো চলে নিয়মিত পড়াশোনা।
এই উদ্যোগের মূল উদ্যোক্তা জপেন চন্দ্র। কারমাইকেল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে ২০১৯ সালে চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন তিনি। কোচিং সেন্টারের উচ্চ ফি পরিশোধ করা সম্ভব না হওয়ায় কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে দলগতভাবে প্রস্তুতি শুরু করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়েতে কর্মরত। শুরুতে সদস্য ছিল সাত-আটজন, পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় অর্ধশতাধিক। এখন নিবন্ধিত সদস্য ৬৫ জন, নিয়মিত অংশ নেন ৫০ থেকে ৫৫ জন।
এনটিআরসিএ আয়োজিত বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সদস্য মঞ্জুর ইসলাম বলেন, ‘স্নাতকোত্তর শেষ করার পরে চাকরির কোচিং করতে কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁরা যে পরিমাণ টাকা চান, তা আমাদের দেওয়া সম্ভব ছিল না। সেদিনই আমরা ছয় বন্ধু মিলে নিজেরাই চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেই সিদ্ধান্ত আমাদের বিফল করেনি।’
পরীক্ষা পদ্ধতিও সুসংগঠিত। সামনে যে নিয়োগ পরীক্ষা থাকে, সেই অনুযায়ী অভিজ্ঞদের পরামর্শে সিলেবাস তৈরি করা হয়। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি এবং তথ্যপ্রযুক্তি থেকে ৯০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হয়। প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্ব পর্যায়ক্রমে একজন সদস্য নেন। যেদিন কার প্রশ্নে পরীক্ষা, সেদিন তিনি পরীক্ষায় অংশ নেন না। পরীক্ষা শেষে সদস্যরা একে অন্যের খাতা মূল্যায়ন করেন। সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া তিনজনকে দেওয়া হয় পুরস্কার। মাসে ২০০ টাকা করে চাঁদা তুলে প্রশ্ন কম্পোজ, ফটোকপি, পুরস্কার ও কখনো হালকা নাশতার ব্যবস্থা করা হয়।
এই গ্রুপ থেকে ইতিমধ্যে অনেকে চাকরি পেয়েছেন। জপেন চন্দ্রের ভাষ্য, নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। সমাজসেবা অধিদপ্তর, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাংলাদেশ রেলওয়েসহ বিভিন্ন দপ্তরে প্রায় ৫০ জন চাকরি পেয়েছেন। সামনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ও নিবন্ধন পরীক্ষা—সেখানেও ভালো ফলের আশা করছেন তাঁরা।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুপারিশ পাওয়া সদস্য বৃষ্টি রানী রায় বলেন, ‘যাঁরা চাকরিপ্রার্থী তাঁরা এই গ্রুপ থেকে অত্যন্ত উপকার পাবেন। এখানে রুটিন অনুযায়ী পড়ালেখার পাশাপাশি পরীক্ষারও প্রস্তুতি হয়ে যাচ্ছে। আমি এখানে যেসব প্রশ্ন চর্চা করেছি, সেগুলো বেশির ভাগই নিয়োগ পরীক্ষায় এসেছিল।’
দলের সদস্যরা জানান, একা প্রস্তুতি নেওয়ার তুলনায় এখানে জটিল বিষয়গুলো সহজে বোঝা যায়। জপেন চন্দ্রের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে দল পরিচালনা করছেন রতন রায়। পড়াশোনার বাইরে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্কও গড়ে উঠেছে। সবার রক্তের গ্রুপের তালিকা রাখা আছে, প্রয়োজনে সদস্যরা রক্তদানেও এগিয়ে আসেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, দল বেঁধে পড়ালেখা তথ্য আদান-প্রদান ও জ্ঞানার্জনের কার্যকর কৌশল। এতে যিনি বোঝেন, তিনি অন্যদের বুঝিয়ে দিতে পারেন—ফলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। তাঁর মতে, এভাবে প্রস্তুতি নিলে চাকরিপ্রত্যাশীদের সফলতার সম্ভাবনা বাড়ে।
সিএ/এমই


