Wednesday, April 8, 2026
25 C
Dhaka

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দেশনেত্রীর শেষ বিদায়

দলমতনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় আপসহীন এই নেত্রীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানায় জাতি। কোটি মানুষের চোখের জলে শেষ হলো তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই অবিসংবাদিত নেত্রীর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধ্যায়।

জীবদ্দশায় দেশবাসীর উদ্দেশে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। বিদেশে আমার আর কোনো ঠিকানা নেই। আমি কোথাও যাব না। সেই ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়ে নিজ দেশের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি। প্রিয় স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি বীর-উত্তম জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজ হাতে মায়ের লাশ কবরে নামান এবং পরে পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান।

দাফন শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধানসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর আগে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এই নেত্রী জীবনে ও মরণে বিরল সম্মানে সম্মানিত হলেন।

ঢাকা মহানগরীর সব সড়ক যেন একত্রিত হয়েছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। কয়েক দিনের কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার পর হঠাৎ দুপুরে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে। বেলা ঠিক ৩টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক মহান আল্লাহর নামে চার তাকবিরের জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন। জানাজা শেষে সংসদ ভবন এলাকা থেকে কড়া নিরাপত্তায় জাতীয় পতাকায় মোড়ানো লাশবাহী গাড়িতে করে বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। বিকাল পৌনে ৫টার দিকে শেরেবাংলা নগরে স্বামীর সমাধির পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক শুরু হয়। সারা দেশে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং কালো ব্যাজ ধারণ করা হয়। সরকার এ উপলক্ষে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয় ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জানাজার নামাজ। নির্ধারিত স্থান ছাড়িয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিমে লালমাটিয়া ও মোহাম্মদপুর, পূর্বে খামারবাড়ি ও ফার্মগেট, দক্ষিণে ধানমন্ডি ও কলাবাগান পর্যন্ত মানুষের ঢল নামে। অনেক মানুষ মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জানাজায় অংশ নেন।

এই বিশাল জনসমুদ্রে কোথাও কোনো রাজনৈতিক স্লোগান শোনা যায়নি। মানুষের মুখে ছিল কেবল কলমা শাহাদাতের ধ্বনি। জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তারেক রহমান ইসলামি রীতি অনুযায়ী মায়ের ঋণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং অজান্তে কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, ‘দোয়া করবেন আল্লাহতায়ালা যাতে উনাকে বেহেশত দান করেন।’ মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে এটিকে সর্ববৃহৎ জানাজা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা হয়েছিল ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের।

দুপুর ১২টার পর জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছে। সকাল ৯টা ১৭ মিনিটে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে কড়া নিরাপত্তায় মরদেহ তারেক রহমানের গুলশান অ্যাভিনিউয়ের বাসায় নেওয়া হয়। এ সময় বিজয় সরণি, আগারগাঁও, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুরসহ আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৩২টি দেশের প্রতিনিধি ঢাকায় আসেন।

জানাজা ও দাফন উপলক্ষে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল, জাতীয় সংসদ ভবন ও জিয়া উদ্যান এলাকায় ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত ছিলেন। গুলশানের বাসায় মায়ের কফিনের পাশে বসে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন তারেক রহমান।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানাজায় উপস্থিত হয়ে তারেক রহমানকে সান্ত্বনা দেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানসহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা জানাজায় অংশ নেন। বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দও শেষ বিদায়ে শরিক হন।

জীবনের শেষ সময়টুকু কেটেছে হাসপাতালে। বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি লিভার সিরোসিস, কিডনি, ডায়াবেটিস, ফুসফুসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পরও তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরবিদায় নেন গণতন্ত্রের এই আপসহীন নেত্রী।

সিএ/এএ

spot_img

আরও পড়ুন

ক্যামেরা বাম্প ছাড়াই স্মার্টফোন বাজারে চমক

স্মার্টফোনে বড় ক্যামেরা বাম্প এখন প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে।...

শিশুদের ক্ষতির অভিযোগে গুগল ও মেটাকে দায়ী করল যুক্তরাষ্ট্রের আদালত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর—এমন অভিযোগে গুগল ও...

বন্ধুত্ব ও বিরোধ কীভাবে পড়াশোনায় বাধা দেয়

শিক্ষাজীবন মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই সময়টিতে সঠিকভাবে...

অস্ট্রেলিয়ার ভিসা বাতিল নিয়ে যা জানালেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

অস্ট্রেলিয়ায় একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর দেশে ফিরে নিজের...

প্রাকৃতিক উপায়ে ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল

গরমের সময় তীব্র তাপমাত্রা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অস্বস্তি তৈরি...

তরমুজের খোসায় লুকিয়ে আছে পুষ্টির ভাণ্ডার

তরমুজ খাওয়ার পর খোসা ফেলে দেওয়া অনেকেরই অভ্যাস। তবে...

জাহেলি যুগ থেকে ইসলামে নারীর অবস্থানের পরিবর্তন

ইসলামের ইতিহাসে নারীর অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। ইসলামপূর্ব...

শেয়ারবাজারে আসছে স্পেসএক্স, মূল্য ছাড়াতে পারে ১ ট্রিলিয়ন ডলার

মহাকাশ প্রযুক্তি খাতে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে আসার প্রস্তুতি...

জ্বালানি সংকটে টেলিযোগাযোগ সেবা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা

দেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো সচল রাখতে জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন...

হাম মোকাবিলায় ইসলাম ও বিজ্ঞানের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ বাড়ায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি...

চৈত্রের তাপ ও শুষ্কতায় বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি

চৈত্র মাসে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বাতাসের শুষ্কতার কারণে অগ্নিকাণ্ডের...

গরমে ত্বক ভালো রাখতে লোশন কেন জরুরি

গরমকালে ত্বক ঘামে ও কিছুটা তেলতেলে থাকে বলে অনেকেই...

চীনে শিশুদের জন্য আসক্তিমূলক ডিজিটাল সেবা নিষিদ্ধের প্রস্তাব

চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক “ডিজিটাল মানব” বা ভার্চুয়াল মানুষের ব্যবহার...

ইবনে হুজাইফা (রা.) এর দৃঢ় ঈমান

ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরামের ত্যাগ ও আত্মনিবেদন অনন্য দৃষ্টান্ত...
spot_img

আরও পড়ুন

ক্যামেরা বাম্প ছাড়াই স্মার্টফোন বাজারে চমক

স্মার্টফোনে বড় ক্যামেরা বাম্প এখন প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে সেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন চমক দেখিয়েছে গুগল। তাদের নতুন স্মার্টফোন পিক্সেল ১০এ...

শিশুদের ক্ষতির অভিযোগে গুগল ও মেটাকে দায়ী করল যুক্তরাষ্ট্রের আদালত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর—এমন অভিযোগে গুগল ও মেটাকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আদালত। রায়ে দুই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬ মিলিয়ন ডলার...

বন্ধুত্ব ও বিরোধ কীভাবে পড়াশোনায় বাধা দেয়

শিক্ষাজীবন মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই সময়টিতে সঠিকভাবে পড়াশোনা ও মনোযোগ ধরে রাখা ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য অপরিহার্য। তবে অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব বা দুশমনির...

অস্ট্রেলিয়ার ভিসা বাতিল নিয়ে যা জানালেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

অস্ট্রেলিয়ায় একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর দেশে ফিরে নিজের ভিসা বাতিল হওয়ার খবর পাওয়ার বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। সোমবার (৬ এপ্রিল)...
spot_img