Tuesday, July 7, 2026
26 C
Dhaka

প্রক্সি গোষ্ঠীর হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সংকট

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের প্রভাবে ইরাকের মরুভূমি ক্রমেই আরেকটি রণাঙ্গনে পরিণত হচ্ছে। ইরানপন্থী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে বাগদাদ সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরাকের সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনার মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে আরব বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের যে চেষ্টা ইরাক চালিয়ে আসছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে। সম্প্রতি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডান এক যৌথ বিবৃতিতে তাদের অবকাঠামোর ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

ছয়টি দেশ এই আন্তসীমান্ত হামলাকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিবৃতিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮১৭ নম্বর প্রস্তাবের উল্লেখ করে ইরানকে অবিলম্বে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে সব ধরনের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এসব হামলার জন্য ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে আরব দেশগুলো ইরাক সরকারকেও কঠোর সমালোচনার মুখে ফেলেছে। তারা মনে করছে, এসব গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় বাগদাদ প্রশাসন পরিস্থিতির জন্য আংশিকভাবে দায়ী। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার ব্যবহারের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে দেশগুলো।

এই পরিস্থিতিতে ইরাক সরকার আঞ্চলিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে। গত বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাগদাদ দাবি করেছে, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশ বা জর্ডানে হামলার অভিযোগ সঠিক নয়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংবিধান ও আইনের আওতায় থেকে তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। পাশাপাশি হামলার বিষয়ে যেকোনো তথ্য বা প্রমাণ গ্রহণে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে জানিয়েছে।

তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে ইরাকের সার্বভৌমত্ব ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইরাকি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মাজেদ আল-কায়সি বলেন, ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক নামের ছাতার নিচে থাকা গোষ্ঠীগুলো প্রতিদিন গড়ে ২১ থেকে ৩১টি হামলা চালাচ্ছে, যার লক্ষ্য উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানের বিভিন্ন স্থাপনা।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে অভিযান শুরুর পর থেকে এসব গোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে ৪৫৪টির বেশি হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার উদ্দেশ্য হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার কৌশলের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

আল-কায়সির মতে, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্বস্তি কমানোর চেষ্টা, কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরান দাবি করে আসছে, তারা মূলত এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর অভিযোগ, হামলায় জ্বালানিকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও হোটেলের মতো বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং সরাসরি দায় এড়ানোর জন্য ইরান ইরাকের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ব্যবহার করছে। কাতারের দোহাভিত্তিক মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক খালেদ আল-জাবের বলেন, প্রক্সি বা ছায়া শক্তির মাধ্যমে হামলা চালানো একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।

খালেদ আল-জাবের বলেন, ইরান সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে এমন কৌশল নিচ্ছে, যাতে রাজনৈতিক ঝুঁকি কম থাকে এবং হামলার দায় নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করা যায়। এর ফলে প্রতিপক্ষকে আড়াল থেকে আঘাত করা সহজ হয় এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয়ও বাড়ে।

এই পরিস্থিতিতে ইরাককে এখন অভ্যন্তরীণ ও কূটনৈতিকভাবে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। কুয়েতের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আহমেদ আবদেল মহসেন আল-মুলাইফি বলেন, যে দেশ আইনবহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়, তাকে পূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা কঠিন।

আল-মুলাইফি আরও বলেন, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে প্রক্সি বাহিনীর ওপর তেহরানের নির্ভরতা আসলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নিজেদের চাপ কমানোর একটি কৌশল। এর মাধ্যমে ইরান আরব দেশগুলোকে তাদের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে স্থল অভিযানের হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে তেহরান কুয়েত ও সৌদি আরবের সীমান্তে নতুন সংঘাতের ফ্রন্ট খুলতে ইরাকভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে আরও সক্রিয় করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরাকের আকাশসীমা দিয়ে যখন নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে ছুটে যাচ্ছে, তখন বাগদাদের কূটনৈতিক আশ্বাস বাস্তবতার সামনে দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ইরাকের সঙ্গে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সম্পর্ক আরও সংকটে পড়তে পারে।

সিএ/এমই

spot_img

আরও পড়ুন

নরওয়েতে দ্রুত বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা, কমছে চার্চের সদস্য

ইউরোপের দেশ নরওয়েতে ধর্মীয় জনসংখ্যার চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা...

সুইডেনে পেশাজীবী মুসলিমদের নতুন বাস্তবতা: সুযোগের পাশাপাশি বাড়ছে সামাজিক চ্যালেঞ্জ

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের দক্ষিণে অবস্থিত সোডারটেলিয়া শহরে গত এক...

প্যারাগুয়েতে মুসলিমদের জীবনযাপন: ছোট একটি সম্প্রদায়ের ধর্মচর্চা, ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে মুসলিমরা সংখ্যায় খুবই কম হলেও...

পরকালের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন ৩ উপায়ে

পৃথিবীর জীবনে মানুষ নানা পরিকল্পনা করলেও একটি সত্য থেকে...

যে কৌশলে মিসর বিজয় করেছিলেন সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)

মুসলিম ইতিহাসে সাহস, কূটনৈতিক দক্ষতা ও রণকৌশলের জন্য বিশেষভাবে...

তীব্র তাপপ্রবাহে সবার জন্য খুলে দেওয়া হলো ফ্রান্সের কয়েকটি মসজিদ

তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত ফ্রান্সে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে কয়েকটি মসজিদের...

নরওয়ের উত্তরে মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে আল-রহমা ও আন-নূর মসজিদ

উত্তর মেরুর কাছাকাছি অবস্থিত নরওয়ের ছোট শহর ত্রোমসোতে গড়ে...

ফেরাউনের সামনে যেভাবে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছিলেন হজরত মুসা (আ.)

হজরত মুসা (আ.) যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বার্তা...

কাতারে উদ্বোধন হলো প্রথম স্মার্ট মসজিদ, কমবে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার

কাতারে প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্মার্ট মসজিদ উদ্বোধন...

৫ আগস্টের আগেই উদ্বোধন হতে পারে জুলাই জাদুঘর

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত জুলাই জাদুঘর আগামী ৫...

নবম পে স্কেলের চূড়ান্ত প্রস্তাব দুই সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিসভায়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের...

টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগে নগরবাসী

টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার...

সার্কের বর্তমান সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও: শামা ওবায়েদ

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট সার্কের বর্তমান অচলাবস্থা শুধু...

বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেল সিরিয়ার ঐতিহাসিক আল-ওমারি মসজিদ

সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দেরা শহরে অবস্থিত ঐতিহাসিক আল-ওমারি মসজিদ ইসলামি...
spot_img

আরও পড়ুন

নরওয়েতে দ্রুত বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা, কমছে চার্চের সদস্য

ইউরোপের দেশ নরওয়েতে ধর্মীয় জনসংখ্যার চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দেশটির ঐতিহ্যবাহী চার্চ অফ নরওয়ের সদস্যসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমলেও মুসলিম কমিউনিটির পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।...

সুইডেনে পেশাজীবী মুসলিমদের নতুন বাস্তবতা: সুযোগের পাশাপাশি বাড়ছে সামাজিক চ্যালেঞ্জ

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের দক্ষিণে অবস্থিত সোডারটেলিয়া শহরে গত এক দশকে মুসলিম সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেছে। তবে এই পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয় বা নতুন কোনো...

প্যারাগুয়েতে মুসলিমদের জীবনযাপন: ছোট একটি সম্প্রদায়ের ধর্মচর্চা, ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে মুসলিমরা সংখ্যায় খুবই কম হলেও দেশটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় ৭৪ লাখ মানুষের এই দেশে মুসলিমের...

পরকালের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন ৩ উপায়ে

পৃথিবীর জীবনে মানুষ নানা পরিকল্পনা করলেও একটি সত্য থেকে কেউই মুক্ত নয়—মৃত্যু। ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং এটি অনন্ত জীবনের সূচনা। তাই...
spot_img