সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনামলে নিখোঁজ হওয়া ডেন্টিস্ট ও সাবেক দাবা চ্যাম্পিয়ন রানিয়া আল-আব্বাসির ছয় সন্তান আর জীবিত নেই বলে জানিয়েছে দেশটির নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধানে গঠিত জাতীয় কমিশন। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শিশুদের ভাগ্য অজানা থাকার পর এই ঘোষণা তাদের পরিবারের জন্য নতুন করে বেদনার কারণ হয়ে উঠেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সিরিয়ার নিখোঁজদের জন্য গঠিত জাতীয় কমিশন (এনসিএমপি) জানায়, দীর্ঘ তদন্ত, তথ্য যাচাই এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া উপাত্ত বিশ্লেষণের পর তারা উচ্চমাত্রার পেশাদার নিশ্চয়তার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে রানিয়া আল-আব্বাসির ছয় সন্তান আর বেঁচে নেই।
২০১৩ সালের মার্চে রাজধানী দামেস্কের নিজ বাসা থেকে রানিয়া আল-আব্বাসি, তার স্বামী আবদুল রহমান ইয়াসিন এবং তাদের ছয় সন্তানকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আটক করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সন্তানদের বয়স তখন ছিল ৩ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। ওই ঘটনার পর পরিবারের কোনো সদস্যেরই আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বছরের পর বছর ধরে তাদের নিখোঁজ থাকার ঘটনা সিরিয়ায় গুম ও নিখোঁজ হওয়া শিশুদের অন্যতম আলোচিত প্রতীকে পরিণত হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
রানিয়ার ভাই হাসান আল-আব্বাসি এক ভিডিও বার্তায় জানান, সম্প্রতি পরিবার এমন কিছু ভিডিও ফুটেজ দেখতে সক্ষম হয়েছে, যা ২০১৩ সালের কুখ্যাত তাদামন হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান সন্দেহভাজনের কাছ থেকে পাওয়া বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভিডিওর একপর্যায়ে অন্ধকার একটি কক্ষে কয়েকজন শিশুকে ‘সন্ত্রাসবাদের বড় অর্থদাতা’ বলে অভিযুক্ত করা হচ্ছিল। যদিও ওই ভিডিওর সব তথ্য এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি, তবুও তদন্তকারীরা এটিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
অন্যদিকে রানিয়া আল-আব্বাসি এবং তার স্বামী আবদুল রহমান ইয়াসিনের পরিণতি সম্পর্কে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা মনে করছে, তারাও নিহত হয়ে থাকতে পারেন। তবে তাদের অবস্থান কিংবা মরদেহ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তদন্তে এমন কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে যা সাবেক সরকারের নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমজাদ ইউসুফকে শিশুদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে। তিনি ২০১৩ সালের তাদামন গণহত্যার অন্যতম অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।
২০২২ সালে প্রকাশিত একটি ভিডিও বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, যেখানে আমজাদ ইউসুফকে চোখ বাঁধা বন্দিদের গুলি করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার পর থেকেই তাদামন হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জোরালো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ এবং আসাদ পরিবারের শাসনামলে গুম, আটক ও নিখোঁজের ঘটনা দেশটির অন্যতম বড় মানবাধিকার সংকটে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৩ লাখেরও বেশি হতে পারে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অতীতের গুম, নিখোঁজ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠন করা হয়েছে। রানিয়া আল-আব্বাসি ও তার পরিবারের ঘটনাও সেই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সিএ/এমই


