পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল ‘বর্বর আক্রমণ’ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ধারণা। তবে নতুন এক জিনোম গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। গবেষকদের দাবি, রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে সহিংস ধ্বংসযজ্ঞের বদলে ধীরে ধীরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ মিশ্রণ ঘটেছিল।
৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন মানব ইতিহাসের একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। সে সময় জার্মান সেনাপতি ওডোয়াসার তরুণ সম্রাট রোমুলাস অগাস্টুলাসকে ক্ষমতাচ্যুত করলে ইউরোপজুড়ে রোমান শাসনের অবসান শুরু হয়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বর্তমান দক্ষিণ জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা। তাদের মতে, রোমান শাসনের শেষ সময়ে উত্তর ইউরোপ থেকে ছোট ছোট জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে আসতে শুরু করেছিল এবং পরবর্তীতে স্থানীয় রোমান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায়।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ। গবেষকরা জার্মানির বাভারিয়া ও হেস অঞ্চলের তথাকথিত ‘সারি সমাধিস্থল’ থেকে পাওয়া ২৫৮ জন মানুষের জিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। এসব সমাধি মূলত ৪৫০ থেকে ৬২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ের বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং ‘জোহানেস গুটেনবার্গ ইউনিভার্সিটি মেইঞ্জ’-এর নৃবিজ্ঞানী জোয়াকিম বার্জার বলেছেন, “ইতালিতে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ও দক্ষিণ জার্মানিতে আমরা যে জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করেছি উভয়ের মধ্যকার সময়ের সামঞ্জস্য একেবারে নিখুঁত।”
গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্রাজ্যের পতনের আগে ও পরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃবিবাহ বেড়ে যায়। এর ফলে স্থানীয় রোমান জনগোষ্ঠী এবং উত্তর ইউরোপ থেকে আসা মানুষদের মধ্যে ধীরে ধীরে সামাজিক ও জিনগত একীভূতকরণ ঘটে।
গবেষকরা বলছেন, আগে ধারণা করা হত বড় বড় যোদ্ধা গোষ্ঠীর আক্রমণে রোমান সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু নতুন তথ্য বলছে, এ অভিবাসন ছিল ছোট ছোট আত্মীয়ভিত্তিক গোষ্ঠী ও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের ধীরগতির স্থানান্তর।
গবেষক বার্জার বলেছেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এ জনস্রোত কোনো বড়, একই নৃগোষ্ঠীর উপ ব্লক বা বড় কোনো বংশের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি, বরং এ ছিল ছোট ছোট আত্মীয়তার গোষ্ঠী এবং বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের ব্যক্তিগত পর্যায়ের অভিবাসন।”
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, সেই সময়ের সমাজে শিশু মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি এবং নারীদের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৪০ বছর, পুরুষদের প্রায় ৪৩ বছর। পাশাপাশি খ্রিস্টধর্মভিত্তিক সামাজিক রীতিনীতির প্রভাবও তখনকার পারিবারিক কাঠামোয় স্পষ্ট ছিল।
গবেষকদের মতে, রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে উত্তর ইউরোপীয়দের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে যে নতুন জিনগত কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক মধ্য ইউরোপের মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে।
সিএ/এমআর


